
স্বাস্থ্য ডেস্ক: দেশেএমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া কেউ নামের পূর্বে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবে না এ দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। আদালতে চলমান এ সংক্রান্ত সব রিটকে আইন ও জনস্বাস্থ্য বিরোধী উল্লেখ করে আগামী ১২ মার্চের মধ্যে নিষ্পত্তি এবং ‘ডিপ্লোমা চিকিৎসক’ নামে বিভ্রান্তিকর কোনো পদবির প্রচলন না করার দাবি জানায় তারা। এক সঙ্গে চিকিৎসকদের পাঁচ দফা দাবির প্রতি সমর্থন ও তা বাস্তবায়ন কর্মসূচিতে পাশে থাকার ঘোষণা দেন। রোববার (৯ মার্চ) রাজধানীর বাংলা মোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে এনডিএফ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘স্বাস্থ্য খাতে চলমান পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ বিষয়ক’ মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানায় জামায়াত সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠনটি। সভায় চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এনডিএফের কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রচুর ষড়যন্ত্র চলছে। প্রতিনিয়ত এ খাতে একের পর এক অস্থিরতা তৈরি করে সমগ্র দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির পাঁয়তারা চলছে। এ অবস্থায় দেশ প্রেমিক চিকিৎসকদের ভূমিকা রাখতে হবে। কোনোভাবে পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের কোনো চক্রান্ত বাস্তবায়ন হতে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসকদের অসংখ্য সমস্যা আছে। পুরো স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেমটা সমস্যায় ভরপুর। আগস্টে পরিবর্তনের পর পর আমাদের কাছে দেশের মেডিকেল কলেজগুলোর অ্যাক্রেডিটেশনে সমস্যা সংক্রান্ত তথ্য আসলো। বিগত সরকারের সময় বোর্ডে যারা কাজ করতেন, তারা খুব সুচিন্তিতভাবে কোনো ফলাফল বের করে আনতে পারছিলেন না। এরপর আমরা উদ্যোগ নিলাম। আমরা শুরুতে বলেছি এ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড পুনর্গঠন করা উচিত এবং এটাকে কার্যকর করা উচিত।
ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিসের সভাপতি ডা. জাবির হোসেন বলেন, এমবিবিএস এবং বিডিএস ছাড়া কেউ ডাক্তার লিখতে পারবেন না এ আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমরা রিট করেছি। বিষয়টি নিয়ে এ পর্যন্ত একানব্বই বার শুনানি হয়েছে, কিন্তু নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আমাদের দাবি, দ্রুত বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক। ম্যাটস থেকে উত্তীর্ণরা অনেক ক্ষেত্রে অপচিকিৎসা দিচ্ছেন, এটা বন্ধ হোক। তিনি বলেন, আমরা চাই না ম্যাটস বিলুপ্ত হয়ে যাক। তারা তাদের সীমার মধ্যে কাজ করুক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ম্যাটস আছে, তারা সারা বিশ্বে চিকিৎসা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু তারা যদি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে আমরা নিশ্চয় বসে থাকবো না। ম্যাটসের কারিকুলামটা পুরোটা গোলকধাঁধাময়। তাদের কারিকুলামে অদ্ভুত কিছু রুলস আছে। তাদের কোর্সটা ছিল এতোদিন ৩ বছর। কিন্তু হঠাৎ করে আন্দোলন করে সেটা ৪ বছর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা সমসময় দেখি কারিকুলাম সংক্ষিপ্তের জন্য উল্টো আন্দোলন করে। কিন্তু তারা আন্দোলন করে বাড়ানোর জন্য। তারা এখন ইন্টার্নশিপ চাচ্ছে। এসব কার্যক্রম পুরোটাই পরিকল্পিত।
এ সময় চিকিৎসক মহলের পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন ইউনাইটেড মেডিকেল অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশের (ইউএমবি) চিফ কো-অর্ডিনেটর ডা. মোবারক হোসাইন। উত্থাপিত দাবিগুলো হলো:
১. এমবিবিএস/বিডিএস ডিগ্রী প্রাপ্তগণ ব্যতীত অন্য কেউ নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবে না এবং আদালতে চলমান এ সংক্রান্ত আইন ও জনস্বাস্থ্য বিরোধী সকল রিট আগামী ১২ মার্চের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং বাংলাদেশে ‘ডিপ্লোমা চিকিৎসক’ নামে বিভ্রান্তিকর কোনো পদবির প্রচলন করা যাবে না, যার অস্তিত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা বিশ্বের কোথাও নেই।
২. রেজিস্টার্ড চিকিৎসক (এমবিবিএস/বিডিএস) ছাড়া অন্য কেউ স্বাধীনভাবে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবে না এ মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।
৩. আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্স কারিকুলাম সংস্কার কমিটি গঠন করে তাদের কোর্স কারিকুলাম পুনঃনির্ধারণ এবং মানহীন সব ম্যাটস (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল) বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
৪. জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের জন্য শূন্যপদে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ এবং চিকিৎসকদের বিসিএস বয়সসীমা ৩৪ বছরে উন্নীত করতে হবে।
৫. অনতিবিলম্বে চিকিৎসক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) প্রণয়ন করতে হবে।
গত বছরের ২০২৪ খ্রি: ১৯ নভেম্বর বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। ৭১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।
এ রায়ে বলা হয়, দুঃখজনকভাবে এটি লক্ষণীয় যে এখানে ২০১০ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী বিএমডিসি নিবন্ধন ভুক্ত মেডিকেল বা ডেন্টাল ইনস্টিটিউট থেকে এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার (Dr.) পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। সেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার’ শীর্ষক অপারেশনাল প্ল্যানের বিভিন্ন পদে কর্মরত হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক কর্মকর্তাদের নিজ নামের আগে ডাক্তার পদবি সংযোজনের অনুমতি প্রদান করেছে যা এককথায় আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত তথা বেআইনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ড থেকে ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন শাখায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের তাদের নামের আগে পদবি হিসেবে ডাক্তার ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করাও বেআইনি।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিকল্প ধারার চিকিৎসা পদ্ধতির পেশাধারীরা নামের আগে ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান, কমপ্লিমেন্টারি ফিজিশিয়ান, ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন প্র্যাকটিশনার এবং কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন প্র্যাকটিশনার পদবি ব্যবহার করতে পারেন। ভারতে বিকল্প ধারার চিকিৎসকেরা ডাক্তার লিখতে পারেন না।
এর আগে ২০২৫ খ্রি: (১২ মার্চ) হাইকোর্টের বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি সাথীকা হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে রায়ের জন্য কার্যতালিকায় (কজলিস্ট) রয়েছে। ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রি প্রাপ্ত ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের এমন বিধান প্রশ্নে জারি করা রুলের ওপর রায় ঘোষণার জন্য কার্যতালিকায় (কজলিস্ট) রয়েছে। এর আগে ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রি প্রাপ্ত ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের এমন বিধান প্রশ্নে রুলের ওপর শুনানি শেষ হয়। ডিএমএফ ডিগ্রিধারীদের নামের আগে ডাক্তার ব্যবহারকে কেন্দ্র করে আইনটির বৈষম্যমূলক প্রয়োগ নিয়ে এক যুগ আগে করা অপর রিটের শুনানি শেষে হয়েছে। পৃথক দুটি রিটের ওপর একসঙ্গে শুনানি শেষে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট একই বেঞ্চ রায়ের জন্য ১২ মার্চ দিন ধার্য করেছেন।
এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন হয়। ডিএমএফ ডিগ্রিধারীদের (ডিপ্লোমাধারী হিসেবে নিবন্ধিত) ক্ষেত্রে আইনটির বৈষম্যমূলক প্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন আহ্বায়ক শামসুল হুদাসহ অন্যরা ২০১৩ সালে একটি রিট করেন। এ আইনের ২৯ ধারার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিশনের সভাপতি ও সেক্রেটারি গত বছর অপর একটি রিট করেন।
গত ২০১৩ সালের ১১ মার্চ প্রথম রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। দ্বিতীয় রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ২০২৪ খ্রি: ২৫ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল দেন। রুলে আইনের ২৯ ধারা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। রুলের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের ২৯ (১) ধারার ভাষ্য, এ আইনের অধীন নিবন্ধন করা কোনো মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক এমন কোনো নাম, পদবি, বিবরণ বা প্রতীক এমনভাবে ব্যবহার বা প্রকাশ করবেন না, যার ফলে তার কোনো অতিরিক্ত পেশাগত যোগ্যতা আছে বলে কেউ মনে করতে পারে। যদি না তা কোনো স্বীকৃত মেডিকেল চিকিৎসা শিক্ষা যোগ্যতা বা স্বীকৃত ডেন্টাল চিকিৎসা শিক্ষা যোগ্যতা হয়ে থাকে।
ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রি প্রাপ্তরা ব্যতীত অন্য কেউ তাদের নামের পূর্বে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। ২৯ (২) ধারার ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করলে তা হবে একটি অপরাধ এবং সে জন্য তিনি ৩ (তিন) বছর কারাদণ্ড বা ১ (এক) লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডণীয় হবেন এবং এ অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রতিবার এর পুনরাবৃত্তির জন্য অন্যূন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে, বর্ণিত দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে দণ্ডণীয় হবেন।

