স্টাফ রিপোর্টার, বান্দরবান: বান্দরবানে লামায় গজালিয়া ইউনিয়নে চম্পা ঝিরি পাড়ায় ম্রো আদিবাসীর গো হত্যা অনুষ্ঠান চিয়াসদ পই আয়োজন আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠান চিয়াসদ পই আয়োজন করে চম্পা ঝিরি পাড়ার কারবারি লংতোই ম্রো। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারী) এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পাড়ার ম্রো আদিবাসীরা অংশগ্রহন করেছে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ সদস্য সিংইয়ং ম্রো। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গালেংঙ্গ্যা ইউপি মেম্বর রেংওয়ে ম্রো ও উন্নয়ন কর্মী রুপা দত্ত। উৎসব পরিবেশে ও আনন্দের সাথে এ অনুষ্ঠান শেষ হয়।

            অনুষ্ঠানের আগের রাতে আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দেয়া হয়। এলাকার বিভিন্ন পাড়া থেকে প্রতিবেশী ও আত্নীয় স্বজন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে। আয়োজন করা হয় গো হত্যা আনুষ্ঠিকতা। সন্ধা থেকে শুরু হয় উৎসব। পাড়ার মাঝখানে একটি গাছ পুতে গরুটিকে সেখনে বেঁধে রাখা হয়। যুবকরা তাদের বাঁশি আর মেয়েরা তাদের ঐতিহ্যগত পোশাক ও অলংকার দিয়ে সাজে। রাত নামার সাথে সাথে বাশি বা প্লুং বাজিয়ে শুরু করে নাচ। যুবকরা বাঁশি বাজিয়ে যুবতীদের নাচার আহ্বান করে মেয়েরা দল বেঁধে নাচ শুরু করে। সকাল পর্যন্ত চলে এ নাচের আয়োজন। সকাল হওার সাথে কাঁচা বাঁশে ফুলগুজে সারাবাড়ী সাজিয়ে রান্না করা শুকর আর মুরগির মাংস দিয়ে নাস্তা করে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু হয় নাচ। যাকে ম্রো ভাষায় পাংইয়ং নাচ। দুই তিন ঘন্টা ধরে চলে এ নৃত্য। অনুষ্ঠানের কর্তার অনুমতি নিয়ে মুরুব্বীরা গরুকে পানি পান করান। তারপর বর্শা এবং বাঁশ দিয়ে গরুটিকে খুচিয়ে হত্যা করে। আয়োজনের খাবার রান্না করা হয় ঐ গরুর মাংস দিয়ে। সন্মানিত অতিথি, অতি ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয়দের আপ্যায়ন করা হয় গরুর রান এবং সিনার মাংস দিয়ে। এ ভাবে সম্পন্ন হয় ‘গো হত্যা’ অনুষ্ঠান ম্রো আদিবাসীর চিয়াসদ পই।


প্রতিটি ধর্মে যেমন কিছু নিজস্ব উৎসব থাকে তেমনি সারা বিশ্বে কিছু অঞ্চল ছোট বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির ও আদিবাসী মানুষরা পালন করে তাদের বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত আচার অনুষ্ঠান। বিশ্বে মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ে এটা বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির ও আদিবাসীর সে ধরনের আচার রেওয়াজ চর্চা। বান্দরবান জেলার ম্রো ও খুমী সম্প্রদায়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পর ঐতিহ্যগত সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান হচ্ছে গো হত্যা। প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী মাসের মধ্যে তা এ অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
ম্রো আদিবাসীর বিশ্বাস ‘থুরাই’ বা সৃষ্টিকর্তা ‘ম্রো’ সম্প্রদায়কে সৃষ্টির পর আলাদা ধর্মগ্রন্থ ও তাদের শিক্ষার সুবিধার জন্য আলাদা অক্ষর, বর্ণমালা বা লিপিমালা সৃস্টি করে কলা পাতায় তা লিখে একটি গরুকে দিয়ে ম্রো আদিবাসীর কাছে তা পোঁছে দিতে ব্যবস্থা করেন। গরু আদেশ মতো তা নিয়ে রওনা হয়। কিন্তু মাঝপথে সে এতো ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে যে সব ভুলে কলা পাতাটি খেয়ে ফেলে। এদিকে ম্রো আদিবাসীরা তাদের ধর্মগ্রন্থ ও বর্ণমালার জন্য বার বার সৃষ্টিকর্তা কাছে প্রার্থনা করতে থাকে। সৃষ্টিকর্তা তখন গরুটিকে আবার ডেকে পাঠান এবং জানতে চান ঐ ধর্মগ্রন্থ ও বর্ণমালা লিখিত কলাপাতাটি সে পৌঁছে দিয়েছে কিনা। গরু তার অপরাধ স্বীকার করে বলে পথে সে এতো ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিল যে সহ্য করতে না পেরে ভুলে তা খেয়ে ফেলেছে। সৃষ্টিকর্তা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে গরুটিকে এক থাপ্পর মেরে উপর পাটির সব দাত ফেলে দেয়। সৃষ্টিকর্তার অভিশাপে তখন থেকে গরুর উপর পাটিতে দাত নেই। তখন থেকে গরু দিয়ে হাল চাষ, গাড়ি টানসহ গরুর অভিশপ্ত জীবন শুরু হয়। তারপর সৃষ্টিকর্তা আদেশ দিয়ে বলেন যতদিন আবার ম্রো জনগোষ্ঠীর ধর্মগ্রন্থ ও বর্ণমালা সৃষ্টি না হবে ততোদিন পর্যন্ত তাকে কলা গাছের সাথে একদিন একরাত বেঁধে রেখে নেচে গেয়ে আনন্দ করে গরুকে হত্যা করা হবে। তার আগে জীবিত অবস্থায় গরুর জিহ্বা বা জীব কেটে নেয়া হবে। শাস্তিস্বরূপ জীবিত গরুর জিহ্বা কেটে ঐ গাছের সাথে গেথে রাখে। যেন গরুরা জীবনে আর এভুল না করে। সে সময় থেকে ম্রো জনগোষ্ঠীর গো হত্যা অনুষ্ঠান চিয়াসদ পই নিয়মিত পালন করে আসছে।

            ম্রো বা মুরুং আদিবাসীরা কেউ বৌদ্ধ ধর্মা আবার কেউ ক্রামা ধর্ম পালন করে থাকে। কিছু ম্রো আদিবাসী ইতোমধ্যে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন বিশ্বাসের অনুসারী ম্রো জনগোষ্ঠীর এখনো প্রকৃতি পূজারী বা সর্বপ্রাণবাদী। বিশেষ করে জুমচাষকে কেন্দ্র করে প্রকৃতি সম্পর্কীয় দেব দেবীদের তারা পূজা করে থাকে। গো হত্যা উৎসব চিয়াসদ পই ম্রো আদিবাসী সমাজে সর্ববৃহৎ সামাজিক অনুষ্ঠান। সাধারণত এ উৎসব আয়োজন করা হয় ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসে। যখন তাদের বাৎসরিক ফসল উত্তোলন শেষ হয়। গৃহের রোগ মুক্তির কামনায়, গৃহ শান্তি ও উচ্চ ফলনের আশায় থুরাই বা সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে মানত করে পূজা দেওয়া হয় এ উৎসবে। আবার পরিবারের কোনো সদস্য দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে তখনো ম্রোআদিবাসীরা কেউ  গো হত্যা অনুষ্ঠানের মানত করে। ম্রোদের বিশ্বাস, গরুর আত্মা তাদের জাতির শক্র। কোনো পরিবারের উপর যখন গরুর আত্মার নজর পড়ে তখন সে পরিবারের সদস্যরা নানা ধরনের রোগশোকে ভোগে। তখন এ থেকে মুক্তি পেতে তারা গো হত্যা অনুষ্ঠান মানত করে। তিনটি গরু হত্যার মাধ্যমে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। ম্রোরা ঝর্ণার পানি দ্বারা জীবন যাপন করে। তাই ঝর্ণার দেবতাকে সন্তুষ্ট করা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্য তারা জীবের বলিদান করে। এ কারণে কোনো পরিবার যখন গো হত্যা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তখন ঝর্ণার দেবতার জন্য একটি গরুকে বলি দিতে হয়।

খবরটি 337 বার পঠিত হয়েছে


আপনার মন্তব্য প্রদান করুন

Follow us on Facebookschliessen
oeffnen