ইরানে সামরিক আগ্রাসনে আমেরিকা ও ইসরায়েল: আলি লারিজানি, গোলাম রেজা সোলাইমানি ও ইসমাইল খতিব নিহত, এ হত্যার চূড়ান্ত প্রতিশোধের হুমকি ইরানি সেনাপ্রধান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি দখলদার ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছে। এটা নিশ্চিত করেছে ইরান। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে তার ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এরপর প্রথম তার মৃত্যুর তথ্য জানায়। এর প্রায় একদিন পর বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত প্রায় ৩ টার দিকে ইরান নিশ্চত করে লারিজানি নিহত হয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিল তার মৃত্যুর ব্যাপারে একটি বিবৃতি দিয়েছে। যা প্রকাশ করেছে ইরানি বার্তাসংস্থা মেহের নিউজ।

            বার্তাসংস্থা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান এবং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শকে সমুন্নত রাখার আমৃত্যু সংগ্রাম শেষে, অবশেষে আলি লারিজানি তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করল। সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে, দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি লাভ করল শাহাদাতের পরম গৌরব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারান সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এরপর ডি ফ্যাক্টো সুপ্রিম লিডারে পরিণত হন লারিজানি। তার কমান্ডে ইরান যুদ্ধ পরিচালনা করছিল। খামেনি প্রাণ হারানোর আগে বলে গিয়েছিল, তার মৃত্যু হলে দায়িত্ব পালন করবে লারিজানি।

            অপরদিকে বাসিজ ফোর্সের প্রধান গোলাম রেজা সোলাইমানি দখলদার ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছে। ইরানের প্যারামিলিটারি বাসিজ ফোর্সের কমান্ডার গোলাম রেজা সোলাইমানি নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে ইরান। গতকাল মঙ্গলবার দখলদার ইসরায়েল জানায় তারা গোলাম রেজাকে হত্যা করেছে।

            ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড তার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, গোলাম রেজা যুক্তরাষ্ট্র-ইহুদিবাদী শত্রুদের হামলায় নিহত হয়েছে। গোলাম রেজা গত ছয় বছর ধরে বাসিজের কমান্ডার দায়িত্ব পালন করছিল।

 

            অন্যদিকে ইরানের গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে হামলা চালিয়ে হত্যার করেছে ইসরায়েল। গতকাল মঙ্গলবার রাতে এক হামলায় সে নিহত হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছে। এ হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন মন্তব্য করেনি তেহরান। ইসরায়েলের এ দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে গত দুদিনের মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতাদের তৃতীয় বড় ধরনের হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হবে এটি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি এবং দেশটির আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজ ফোর্সের প্রধান গোলাম রেজা সোলেইমান নিহত হন।

            গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি বাহিনীকে অন্যান্য ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যার জন্য আগাম অনুমোদন দিয়ে রেখেছে।

            এ হত্যার ইরানের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। বুধবার এক বিবৃতিতে এ হুমকি দিয়েছে। বিবৃতিতে ইরানি সেনাপ্রধান বলেছে, আলী লারিজানি এবং অন্যান্য শহীদদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। উপযুক্ত সময়ে এবং স্থানে অপরাধী আমেরিকা এবং রক্তপিপাসু জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীকে একটি চূড়ান্ত, প্রতিরোধমূলক এবং দুঃখজনক জবাব আমরা দেবো।

            ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পৃথক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে। আলী লারিজানির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইতোমধ্যে ইসরায়েলের কেন্দ্রস্থলে এক গুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিমান অভিযান পরিচালনা করে ইসরায়েলি বাহিনী। সে অভিযানে লক্ষ্যবস্তু করা হয় আলী লারিজানিকে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একান্ত আস্থাভাজন হওয়ার কারণে লারিজানিকে খামেনির ডানহাত বলা হতো। ইরানে চলমান যুদ্ধে নিহত সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে লারিজানি সর্বজ্যেষ্ঠ। সর্বশেষ তাকে জনসম্মুখে দেখা গিয়েছিল গত ১৩ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার। এ দিন তার মাথার দাম ১০ লাখ ডলার ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।

            গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর ইরানে ব্যাপক আকারে যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ সামরিক অভিযান শুরু করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েল। পারমাণবিক স্থাপনা ধংস, ক্ষেপনাস্ত্র সক্ষমতা গুড়িয়ে দেয়া, দেশের সরকার ও শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষে সামরিকে আগ্রাসন শুরু করে আমেরিকা ও ইসরায়েল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে এ যৌথ হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অস্থিতিশীল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ হামলার প্রতিশোধে ইরান অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪ শুরু করে ইতোমধ্যে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে ২৭ টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

সূত্র: মেহের নিউজ, তাসনিম নিউজ, আলজাজিরা, এএফপি ও বিবিসি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *