
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনির দাফনেরু প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। শুক্রবার (০৩ জুলাই) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ মাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড মুসল্লাহতে তার মরদেহটি রাখা হয়েছে। সেখানে আরও চারটি কফিন আছে। যার মধ্যে আছে এক শিশুর। সবগুলো কফিন ইরানের পতাকায় মোড়ানো। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েলের যৌথ হামলায় পরিবারের অন্যান্য সদস্য সাথে নিহত হন আলি খামেনি। খামেনির সঙ্গে আরও যে মরদেহগুলো আছে সেগুলো হলো তার মেয়ের জামাই মেসবাহ উল হুদা বাঘেরি, তার সবচেয়ে বড় মেয়ে সৈয়দা বুশরা হোসেইনি খামেনি, তার ছেলের বউ ও বর্তমান সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং তার ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদী গোলপায়গানি।
এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনি ও তার সঙ্গীদের মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আনা হয়েছে। সেখানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুই দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ধর্মীয় পণ্ডিত এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। এ ছাড়া সাবেক নেতাকে সম্মান জানাতে ইরানের স্বীকৃত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিরা এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছে। তার দাফন প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ভারত, জর্জিয়া ও কিউবা অন্যান্য ৩০টিরও বেশি দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা ইরানে পৌঁছেছে। একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের পর শুক্রবার থেকে সর্বজনীন শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং নেতার কার্যালয়ের কর্মীদের স্বজনরা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বস্তরের ইরানিদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ অনুষ্ঠান চলবে এবং তেহরানে একটি বিশাল র্যালির আয়োজন করা হবে। এ সময়ে খামেনির মরদেহ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। এরপর পবিত্র শহর কোমে আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নজফে আরও কিছু কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। সবশেষে ৯ জুলাই মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।

খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে বিশ্বনেতারা: ইরানের সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে বিশ্বনেতারা। ইরানের সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি বিদেশি অতিথিরা শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। বিদেশিদের শ্রদ্ধার জন্য রাজধানী তেহরানে তার মরদেহ রাখা হয়। এর সঙ্গে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মরদেহ আছে।
খামেনির সাত দিনব্যাপী শেষ বিদায়ের দাফনের আনুষ্ঠানিকতা: খামেনিকে শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ৩ জুলাই তেহরানে শুরু হয়েছে। এটি ইরান ও ইরাক জুড়ে সাত দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হবে।
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বজনীন শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হবে। সর্বসাধারণকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের মরদেহ সাথে খামেনির কফিন গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। বিশাল জনসমাগমের জন্য নির্মিত গ্র্যান্ড মোসাল্লা ইরানের অন্যতম বৃহত্তম প্রার্থনাস্থল। এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৬ ও ৭ জুলাই তেহরানের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে বিশাল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। খামেনি কয়েক হাজার আলেম এ শহরে অধ্যয়ন ও শিক্ষাদান করেছে।
৮ জুলাই নজফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এরপর ইরাকের নজফ ও কারবালা শহরে বড় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। নজফের ইমাম আলীর মাজার শিয়াদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতি বছর সেখানে লাখো তীর্থযাত্রী আসেন। এখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর চাচাতো ভাই ও জামাতা হজরত আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধি রয়েছে। কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন ও তার সৎভাই আব্বাসের মাজার শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এবং আব্বাস শহীদ হন। এ ঘটনাটি শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
৯ জুলাই এরপর মরদেহটি চূড়ান্ত দাফনের জন্য ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে। মাশহাদ ইরানের পবিত্রতম শহর। ইমাম রেজা শিয়া মতাবলম্বীদের কাছে অষ্টম ইমাম পরিচিত। শহরটি আলি খামেনির জন্য ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্মগ্রহণ করে এবং জীবনের একটি বড় অংশ সেখানে কাটান। কোমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগে তিনি মাশহাদের ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতে অধ্যয়ন করেছিল।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি: ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে দেশের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তার মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সাল থেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে আসছিল। পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক নেতা ছিল খোমেনি। অন্যদিকে সে বিপ্লবের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খামেনি। খামেনির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হয়েছে তার ছেলে মোজতবা খামেনি। তার শাসনামলের শুরুতে এত বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন হতে যাচ্ছে। যদিও সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের প্রাক্কালে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে তিনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়। খামেনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের হুমকি মোকাবিলায় একটি উন্নত প্রতিরক্ষা কৌশল প্রতিষ্ঠা করে। তার শাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় অর্থনৈতিক দুর্দশাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী অস্থিরতায় রূপ নেয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয় আলি খামেনি। এরপর যুদ্ধ চলায় এতদিন তাকে দাফন করা হয়নি। এখন যুদ্ধ থামায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খামেনিকে শেষ বিদায় জানানো হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর ইরানে ব্যাপক আকারে যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ সামরিক অভিযান শুরু করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েল। পারমাণবিক স্থাপনা ধংস, ক্ষেপনাস্ত্র সক্ষমতা গুড়িয়ে দেয়া, দেশের সরকার ও শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে আমেরিকা ও ইসরায়েল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে এ যৌথ হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অস্থিতিশীল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ হামলার প্রতিশোধে ইরান অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪ শুরু করে ইতোমধ্যে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে ২৭ টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
সূত্র: আল জাজিরা, মেহের নিউজ, সিএনএন

