
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে পরমাণু শক্তি ও সরকার পরিবর্তনের লক্ষে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা ও ইসরায়েল। এ সামরিক অভিযান ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬) নিহত হয়েছে। রোববার (১ মার্চ) বার্তাসংস্থা তাসনিম, ফার্স নিউজ ও ইরানের সরকারি-বেসরকারি সব সংবাদ মাদ্যম নিশ্চিত করেছে খামেনির নিহতের তথ্য। ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ইরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে পুরো ইসরায়েল জুড়ে সাইরেন বাজতে শোনা গেছে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি চলছে। ইসরায়েল এ অভিযানের প্রথম মিনিটের ‘ডেকাপিটেট স্ট্রাইক’ বা শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার ঘটনাটিকে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। এর ফলে ইরানের কমান্ড চেইন ভেঙে পড়েছে এবং তেহরানের পক্ষে দ্রুত ও সংগঠিত কোনো পাল্টা জবাব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইআরআইবি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, আমাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা শহীদ হয়েছে। ইরানকে সমুন্নত রাখতে এ মহান পণ্ডিত এবং যোদ্ধা তার জীবন উৎসর্গ করেছে। খানের নিহতের ঘটনায় ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করেছে ইরান। গতকাল (শনিবার) সকালে তার প্রাসাদকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি ও মার্কিন সেনারা। তারপর রাতের দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রথমে খামেনি নিহত হয়েছে তা জানান। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির নিহতের তথ্য নিশ্চিত করে। সরকারিভাবে ইরান প্রথমে খামেনির নিহতের তথ্য স্বীকার করেনি। অবশেষে রোববার বাংলাদেশ সময় সকালে খামেনির নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করেছে তেহরান।
ইরানে ক্ষমতাসীন শিয়াপন্থি ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সে সঙ্গে পার্লামেন্ট, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, অর্থ ও ব্যাংক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ ও ইরানের সর্বক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত গভীর এবং সর্বব্যাপী। মূলত তার নির্দেশনাতে ইরানের সরকার চলতো। ১৯৭৯ সালে ইরানের তৎকালীন শাহ (রাজা) মুহম্মদ রেজা শাহ পাহলভিকে হটিয়ে ইরানের জাতীয় ক্ষমতা দখল করে শিয়াপন্থি বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী, শাহবিরোধী রাজনৈতিক দল এবং কমিউনিস্ট দলগুলো। সে বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিল আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। বিপ্লবের পর তিনি হন ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। ১৯৮৯ সালে বয়স জনিত অসুস্থতায় মারা যান খোমেনি। তার মৃত্যুর পর দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
এ সামরিক হামলায় ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মেয়ে ও নাতি নাতনি নিহত হয়েছে। ইরানি সংবাদ মাধ্যমে বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স আজ রোববার এ তথ্য জানিয়েছে। দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছে খামেনি তাদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে।

এ সামরিক যৌথ হামলায় আরো নিহত হয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দোলরহিম মৌসাভি। দেশটির আধাসরকারি সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সে দিন দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগের দুই জন খুব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিহত হয়েছিল। এরা হলেন সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর শীর্ষ কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপৌর এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আলী শামখানি।
অপরদিকে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী (আইএএফ) তাদের অপারেশন রোরিং লায়ন এর শুরুর ধাপে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ইরানের ৪০ জন সিনিয়র কমান্ডারকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি নস্যাৎ করতে এ আগাম হামলা চালানো হয়েছে এ দাবি করেছে তেল আবিব। তেহরানের বেশ কয়েকটি স্থানে একই সময়ে এ হামলা চালানো হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পরিষদের সাতজন সদস্য যেখানে সমবেত হয়েছিল, সেখানেও আঘাত হানা হয়েছে। এ হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভি নিহত হয়েছে। এর আগের এক অভিযানে মোহাম্মদ বাঘেরি নিহত হওয়ার পর মুসাভিকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

এ যৌথ সামরিক অভিযানের প্রথম পর্যায়ে ইসরায়েলের ২০০ টির বেশি যুদ্ধবিমান ইরানের ৫০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে এ হামলার পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। হামলার শুরুতে রাডার এবং বিমান বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা হয়। দ্বিতীয় অবস্থায় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম ধ্বংস করা হয়। যাতে তারা ইসরায়েলে পাল্টা বড় কোনো হামলা চালাতে না পারে। ইরানের পবিত্র নগরী কোমের কাছে একটি বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মজুত ছিল।
ইসরায়েলের এ অভিযানের সমান্তরালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে একটি সমন্বিত অভিযান শুরু করেছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রায় ৯০০ টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
সূত্র: সিএনএন, এক্সিওস

