মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাঁচ বছর পর এবার আনুষ্ঠানিক দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা ও জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে তিনি এ পদে নির্বাচিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর তার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠিত হলো। সংবাদ সংস্থাগুলোর চলমান ভোট গণনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামরিকপন্থী সংসদে প্রদত্ত ৫৮৪ টি ভোটের মধ্যে মিন অং হ্লাইং কমপক্ষে ২৯৩ টি ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করেছে।

            ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার মাত্র সাত দিন পর জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দেশটি এক বছরের মধ্যে বেসামরিক শাসনে ফিরে যাবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তার সময় লেগেছে দীর্ঘ পাঁচ বছর। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পদে বসার জন্য ইতোমধ্যে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হলে তাতে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে মিন অং হ্লাইং এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং কট্টরপন্থি ও নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন উ এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এ ছাড়া তিনি একটি নতুন পরামর্শদাতা পরিষদ গঠন করেছে। এ পরিষদের কাছে বেসামরিক ও সামরিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে। এক কথায়, সামরিক পোশাক খুললে ক্ষমতা যেন কমে না যায়, সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন তিনি।

২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে অং সান সু চি এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংসদ যখন তাদের আরও এক মেয়াদের অনুমোদন দিতে যাচ্ছিল। ঠিক সে মুহূর্তে ক্ষমতা দখল জনরোষ উসকে দেয়। মিন অং হ্লাইং তা সামলাতে ব্যর্থ হন এবং গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করে। এটি গৃহযুদ্ধের সূচনা করে, যা  কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং দেশটির অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। সামরিক শাসন দেশের বিশাল এলাকা সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর জবাবে তারা বিরোধী পক্ষের নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলোতে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়েছে। যা স্কুল, বাড়ি এবং হাসপাতাল ধ্বংস করেছে। মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল “চার আঘাত” (ফোর কাট) এর লক্ষ্য হলো বিদ্রোহী গোষ্ঠী সমর্থনকারী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা। তবে চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক বাহিনী গত দুই বছরে হারানো কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।

            মিয়ানমারের বহু বছর কারাগারে কাটানো রাজনৈতিক কর্মী মিয়া আয় এ সপ্তাহে একটি বিরল কণ্ঠ নিয়ে সামনে এসেছে। তার যুক্তি, সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সামরিক বাহিনী এবং বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা খোঁজা। তিনি একটি নতুন কাউন্সিল গঠন করেছে এবং সংলাপ আহ্বান ও সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করে সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে। এ নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। মিন অং হ্লাইং জনগণের সঙ্গে খেলা খেলছে। বর্তমান সংবিধান দিয়েও এগোতে পারব না। জনগণ ক্লান্ত, আর যদি কোনো পথ না খুঁজে পাই, দেশ ধসে পড়বে। কারাবন্দি অং সান সু চি মুক্তি পেলে, ৮০ বছর বয়সে তিনি সমঝোতা খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ বছর যেকোনো সময় মিন অং হ্লাইং তাকে মুক্তি দিতে পারেন বলে তিনি মনে করেন। তবে মিয়ানমারে শান্তির পথ থাকলে তা অত্যন্ত সংকীর্ণ, এবং সামরিক শাসকরা আপাতত সে পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়।

সূত্র: আল জাজিরা ও বিবিসি বাংলা

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *