ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: বিশাল ভরাডুবি ৩০০ আসনে একটি পায়নি জাতীয় পার্টি, কোন আসন জেতেনি অন্যান্য ৪২ রাজনৈতিক দল

জাতীয় ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। সারাদেশে ১৯৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটিতে জয়ের দেখা পায়নি লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীরা। এ সংসদ নির্বাচনে বিশাল ভরাডুবি, ৩০০ আসনে একটি পায়নি জাতীয় পার্টি। এমনকি দলটির চার দশকের ইতিহাসে এ প্রথম তাদের ‘দুর্গ’ পরিচিত রংপুরের কোনো আসনে জয় পায়নি দলটি। দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে গত ৪০ বছরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে এমন নজিরবিহীন ভরাডুবির মুখে আর কখনো পড়তে হয়নি জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আদি নিবাস রংপুর শহরে হওয়ায় এ অঞ্চলটি বরাবর লাঙ্গলের শক্তিশালী ভোটব্যাংক পরিচিত ছিল। এবারের নির্বাচনে সেখানে বড় জয় পেয়েছে জামায়াত।

            রংপুরের আসনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়

            রংপুর-১: এ আসনে জামায়াতের রায়হান সিরাজী ১ লাখ ৭৪ হাজার ২৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মোকারম হোসেন সুজন ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছে ৬৯ হাজার ১৩১ ভোট।

            রংপুর-২: জামায়াতের এটিএম আজাহারুল ইসলাম ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছে ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট।

            রংপুর-৩: জামায়াতের মাহবুবার রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি শামসুজ্জামান সামু পেয়েছে ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। এ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিল।

            রংপুর-৪: এনসিপি আকতার হোসেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।

            রংপুর-৫: জামায়াতের গোলাম রব্বানী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি গোলাম রব্বানী পেয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১১৬ ভোট।

            রংপুর-৬: এ আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত। দলটির প্রার্থী নুরুল আমীন পেয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সাইফুল ইসলাম পেয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট।

            রংপুরের বাইরে গাইবান্ধা-১ আসনে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী। এ আসনে জামায়াতের মাজেদুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী পেয়েছে ৩৭ হাজার ৯৯৭ ভোট। এ আসনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব হায়দার পাটোয়ারী লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছে ৩৩ হাজার ৯৭৬ ভোট।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, জাতীয় পার্টির এ ঐতিহাসিক পরাজয় দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

            অপরদিকে কোন আসন জেতেনি অন্যান্য ৪২ রাজনৈতিক দল। দেশব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার প্রথম জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিবন্ধিত ৫৯ টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১ টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ৫১ দলের মধ্যে ৪২ দলের কোনো প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেনি। মাত্র ৯ টি দলের প্রার্থীরা সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছে। ২৯৯ আসনে ভোট হলে এখন পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে ২৯৭ টি। এর মধ্যে বিএনপি ২০৯, জামায়াতে ইসলামী ৬৮ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ৬ আসনে জয়ী হয়েছে।

            এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস একটি করে আসনে জয় পেয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জয় পেয়েছে দুটি আসনে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ এ তথ্য জানান।

            আখতার আহমেদ জানান, ভোট হলে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল নিয়ে গেজেট এখন হবে না। একজন প্রার্থী মারা যাওয়ার কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোট পরে অনুষ্ঠিত হবে। এ সংসদ নির্বাচনে ৪২ দলের ভরাডুবি হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১ দলের মধ্যে ৪২ দল কোনো আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। অনেক দল শতাধিক আসনে প্রার্থী দিলে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে।

            রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় দলকেন্দ্রিক মেরুকরণ, জোটভিত্তিক নির্বাচন এবং কৌশলগত ভোটিংয়ের কারণে ছোট ও নতুন দলগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে মাত্র ৯ টি রাজনৈতিক দল ও কিছু স্বতন্ত্র সদস্য। বাকি ৪২ দলের জন্য এবারের নির্বাচন হয়ে থাকলো হতাশার অধ্যায়।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *