
জাতীয় ডেস্ক: অমর একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার রাত ১২ টা ০১ মিনিটে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে রাত ১২ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদনের পরপর পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তারা কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হাজারো মানুষ ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতে শরিক হন। মোনাজাত শেষে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে পুনরায় শ্রদ্ধা জানান। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতারা শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মহিলা ও শিশু এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, তথ্য মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ নির্বাচন কমিশনারগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর যথাক্রমে তিন বাহিনীর সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌ বাহিনী প্রধান এডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন পুস্পস্তবক অর্পণ করেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশী সংস্থার প্রধানরা শ্রদ্ধা জানান। এরপর ১১ দলীয় জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সাথে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। পরে একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

প্রথম প্রহরের শ্রদ্ধা নিবেদন যখন চলছিল, তখন নিরাপত্তা বেষ্টনির বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন হাজারো মানুষ। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ সমবেত হয়েছেন শহীদ মিনারের আশপাশে। শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে তারা অপেক্ষা করছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শেষ হলে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২ টা ছোঁয়ার আগে হাজারো মানুষ হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে যান শহীদ মিনার অভিমুখী লাইনে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণের অপেক্ষায় দাঁড়ান।
রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পলাশ-শিমুল ফোটার এ দিনে বাঙালি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সে সব বীর সন্তানদের, যারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের এ দিনে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বাঙালির প্রাণের এ দিনে সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে সে কালজয়ী গান, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। বায়ান্নর সে উত্তাল দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমে আসা ছাত্রদের ওপর তৎকালীন পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছিল এক অনন্য ইতিহাস। সে গৌরবোজ্জ্বল ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর ও জব্বারসহ নাম না জানা শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মায়ের ভাষা। এ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। যা এ দিনে সারা বিশ্বে পালন করা হচ্ছে। একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২ টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। অমর একুশে উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এ দিনটি একই সঙ্গে শোক ও অপরিসীম গৌরবের। মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানের এমন নজির বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। জাতি এ দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে ভাষা শহীদদের স্মরণ করার পাশাপাশি বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি এ দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি। এ দিনে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। এছাড়া উত্তোলন করা হবে কালো পতাকা।

