ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: তিন দেশে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী, মেক্সিকো সরকারের স্কুল স্থগিত ও হোম অফিসের সিদ্ধান্ত, ফিফার বিশ্বকাপের টিকিটের গলাকাটা মূল্য

খেলা ডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াই দেখতে ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের সমাগম ঘটেছিল। ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস ৯৬ বছর। এবার প্রথম তিনটি দেশ যৌথভাবে এ মেগা ইভেন্ট আয়োজন করেছে ফিফা। যার পরিধি অনেক বিস্তৃত এবং বহু নতুনত্বে মোড়ানো থাকবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার আসর। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলো প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছেন মার্কো বালিচ। তিনি অলিম্পিকের বেশ কয়েকটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেরও নেপথ্যের কারিগর। প্রায় ৮৭ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা উঠেছে। সব মিলিয়ে আধাঘণ্টার মতো হয়েছে মেক্সিকো পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তিন পর্বের উদ্বোধনীর বাকি দুই পর্ব হবে আরও দুই সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। প্রথম পর্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা ও নাইজেরিয়ান শিল্পী বার্না বয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’ পরিবেশন করেছে। বিশ্বকাপ মানে যেন শাকিরার গান। আরও একবার সমর্থকদের সুরের মূর্ছনায় ভাসালেন শাকিরা। এ ছাড়া বিশ্বকাপের আরেকটি মূল গান ডিএনএ একটি যৌথ পারফরম্যান্স তুলে ধরেন আন্দ্রেয়া বোচেলি, ডেভিড গেটা, মেগান থি স্ট্যালিয়ন এবং ইজেএ। বিশ্বখ্যাত তারকাদের পাশাপাশি পারফর্ম করেছে মেক্সিকোর স্থানীয় শিল্পীরা। দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতির ছোঁয়া ছিল উদ্বোধনীতে। স্থানীয় নৃত্যশিল্পীরা উদ্বোধনীতে পারফর্ম করেছে। মেক্সিকো সিটির কনসার্টে মেক্সিকান সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হবে। এতে আদিবাসী এবং আধুনিক লোকজ শিল্পীদের পরিবেশনা থাকবে। মেক্সিকোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশটির গ্র্যামিজয়ী পপ ব্যান্ড মানা সঙ্গীত পরিবেশন করবে। এ ছাড়া আয়োজনে অংশ নেবেন আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশিন, জে বালভিন, লিলা ডাউন্সের মতো তারকা ও লস অ্যাঞ্জেলস আজুলস ব্যান্ড। শাকিরা-বার্না বয় গাইবেন অফিসিয়াল থিম সং।

            বিশ্বকাপের উদ্বোধনী তিন দেশে: প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপের মেক্সিকো ও একাধিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। তাও আবার তিনটি পৃথক দেশ ও পৃথক দিনে। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে সাড়ে ১১ টায় শুরু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এ ম্যাচে প্রথম বার স্কোয়াডের ২৬ সদস্যকে মাঠে নামতে হবে জাতীয় সঙ্গীতের সময়। আর দুই দলের খেলোয়াড়রা বৃত্তাকার হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াবেন। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ আসরেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল ম্যাচ শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে। আরও একটি মিল আছে এ আসরের সঙ্গে। কলম্বিয়ার জনপ্রিয় পপস্টার শাকিরা ‘ওয়াকা ওয়াকা’ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং গেয়েছিল এ বিশ্বকাপে। যা তাকে অমরত্ব দিয়েছে। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ‘লা লা লা’ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং দিয়ে নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভিন্ন আমেজ যোগ করেন শাকিরা। ২০২৬ আসরেও জনপ্রিয় নাইজেরিয়ান আফ্রোবিটস সংগীতশিল্পী বার্না বয়ের সঙ্গে মিলে তিনি উপহার দিয়েছে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং দাই দাই (চলো এগিয়ে যাই)। আগে বলা হয়েছিল বিশ্বকাপের থিম সং গাওয়া শাকিরা-বার্না বয় ফাইনালের বিরতিতে সঙ্গীত পরিবেশন করবে। পরে জানানো হয় মেক্সিকোয় হতে যাওয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং নিয়ে থাকছে তারা। শুক্রবার (১২ জুন) রাত ১ টায় মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিকদের সঙ্গে লড়বে দক্ষিণ আফ্রিকা।

            বিশ্বকাপের উদ্বোধনী কানাডা: কানাডায় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ শুক্রবার ১২ জুন, টরোন্টোতে স্বাগতিক দল এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনা মুখোমুখি হবে। এর আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজনে পারফর্ম করবে কানাডীয় শিল্পী অ্যালানিস মরিসেত্তে, মাইকেল বুবলে, অ্যালেসিয়া কারা, উইলিয়াম ফ্রিন্স এবং লস অ্যাঞ্জেলস ভিত্তিক বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে সঞ্জয়। থাকবেন ইলিয়েনা, জেসি রেইজ এবং বলিউড তারকা নোরা ফাতেহিও। কানাডার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির মোজাইক-প্রেরণায় নতুন রূপায়ণ তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে দেশটির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও নানা সম্প্রদায়ের প্রতিফলন হবে সেখানে।

            বিশ্বকাপের উদ্বোধনী যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে শনিবার (১৩ জুন) লস অ্যাঞ্জেলসে লড়বে স্বাগতিক ফুটবল দল এবং লাতিন দেশ প্যারাগুয়ে। ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ থাকবে মার্কিন গায়িকা ও গীতিকার ক্যাটি পেরি। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে পারফর্ম করবে আটলান্টার র‍্যাপ তারকা ফিউচার, যার আসল নাম নেভাডিয়াস উইলবার্ন। এ ছাড়া থাকছে আনিতা, লিসা, রেমা ও টাইলার পরিবেশনা।

            বিশ্বকাপ উপলক্ষে মেক্সিকো সরকারের স্কুল স্থগিত ও হোম অফিসের সিদ্ধান্ত: বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচকে সামনে রেখে মেক্সিকো সিটির সব স্কুলে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে এবং সরকারি কর্মচারীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর উদ্বোধনী ম্যাচের আগে রাজধানী শহরের যানজট কমাতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবম একটি বিশেষ ডিক্রি জারি করেছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সব স্তরের স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে। সরকারি দপ্তরে কর্মরত ফেডারেল কর্মচারীদের জন্য দূর থেকে কাজ করার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতেও খুব একটা জরুরী নয় এমন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ব্যবস্থা শুধু টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনের জন্য কার্যকর থাকবে।

            ফিফার বিশ্বকাপের টিকিটের গলাকাটা মূল্য: উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াই দেখতে ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের সমাগম ঘটেছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দিনে দেখা গেল এক ভিন্ন ও হতাশাজনক চিত্র। গ্যালারির সারিবদ্ধ ফাঁকা আসন ফিফাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কাঠগড়ায়। গ্রুপ ‘এ’ এর ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ ব্যবধানে চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়েছে। এদিন মাঠের ফুটবলের চেয়ে গ্যালারির শূন্যতা এখন ফুটবল বিশ্বে আলোচনার মূল কেন্দ্রে। ফিফার অফিশিয়াল হিসেব অনুযায়ী, ৪৬ হাজার আসন বিশিষ্ট গুয়াদালাহারার স্টেডিয়ামটিতে রোববারের ম্যাচে মোট দর্শক উপস্থিতি ছিল ৪৪,৯৮৫ জন। কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরের ছবি এবং রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে ভিন্ন কথা। গ্যালারির একাধিক সারিতে শত শত আসন সম্পূর্ণ খালি পড়ে ছিল। যা ধরা পড়েছে টেলিভিশনের পর্দায়। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা সাধারণ দর্শকরা এর জন্য সরাসরি ফিফার টিকিটের গলাকাটা মূল্যকে দায়ী করেছে। মেক্সিকোর ফুটবল ভক্তদের দাবি, স্থানীয় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে বিশ্বকাপের টিকিটের দাম। মজার ব্যাপার হলো, ম্যাচটি শুরু হওয়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো টিকিটের চড়া মূল্যের পক্ষে জোর গলায় সাফাই গেয়েছিল। তিনি দাবি করেছিল, টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য ৬০ ডলার, যা আমেরিকার অন্য যেকোনো বড় খেলার চেয়ে কম। এমনকি টিকিট পাওয়ার চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি এ দাবি করেছিল। এফএসই’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে টিকিটের দাম গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত বা সাধারণ ফুটবল প্রেমীদের পক্ষে টিকিট কেটে মাঠে ঢোকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *