ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: ভোট সুষ্ঠু হলেও গণনায় ১০ শতাংশ কারচুপি হয়েছে নাহিদ ইসলাম, অন্যায়ের প্রতিকার না পেলে বাধ্য হবো আমাদের পথ ধরতে জামায়াত আমির

জাতীয় ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হয়ে গেল। জনগণ ৬০ শতাংশের বেশি সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গণভোটের মতো জনগণ কিন্তু ১১ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ১০ শতাংশের মতো ভোট কারচুপি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভোট গণনার ফলাফলে কারচুপি করা হয়েছে। না হলে এ পুরা ভোটটা ১১ দলের পক্ষে আসতো। শেষ মুহূর্তে ১১ দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষমতা নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আন্দোলনের হুমকি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, যারা ১১ দলের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছে, ১১ দলের নেতা-কর্মী, সমর্থকদেরকে হেফাজতের স্বার্থে প্রয়োজনে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ১১ দল। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

            নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের অবস্থান খুব সুস্পষ্ট। এ নির্বাচনে সুস্পষ্টভাবে ফলাফলে কারচুপি হয়েছে। একটা পর্যায় পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়েছিল। আমরা সেটাকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু ফলাফল যখন ঘোষণা করার সময় হয়েছে এ সময়টাতে স্পেসিফিক অনেকগুলো আসনকে টার্গেট করে কারচুপি করা হয়েছে৷ তিনি বলেন, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হকের ঢাকা-১৩ আসন, ঢাকা-৮ আসন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের আসন। এরকম স্পেসিফিক কয়েকটা আসনকে টার্গেট করে সেটার ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রগুলোকে দখল করে সে কেন্দ্রে জোর করে প্রশাসনকে ব্যবহার করে সে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখন যে কথা আমরা শুনেছি, আমরা সে প্ল্যানের একটা বাস্তবায়ন বা সে প্ল্যানের একটা স্বরূপ কিন্তু এ নির্বাচনে দেখতে পাচ্ছি। এ ধরনের ফলাফল কারচুপি করে যারা পুরনো আমলে আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচন করেছে, সে ধরনের প্রচেষ্টা আমরা তাদের ভেতর দেখতে পাচ্ছি।

নির্বাচন-পরবর্তীতে দেশব্যাপী ১১ দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপরে হামলার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে সেটা নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন এসেছে। কারণ নির্বাচনের পরদিন যারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপরে হামলা, সারাদেশে নির্বিচারে বাড়িঘরে হামলা, আগুন লাগানো, হুমকি এবং এলাকা ছাড়া করতেছে তাদের কাছে এ দেশের জনগণ এ দেশের মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। দেশবাসীর সামনে এমন প্রশ্নের সামনে আমরা ১১ দল কিন্তু ঐক্যবদ্ধ উল্লেখ করে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জামায়াত আমির শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, এটার জন্য রাজপথে নামার প্রয়োজন হলে আমরা সেটার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ এ দেশের মানুষকে যারা ১১ দলের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছে, নেতা-কর্মী, সমর্থকদেরকে হেফাজত করা তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।

            জনগণকে অভিবাদন জানিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, জনগণ এতো প্রতিকূলতার মধ্যে ১১ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ১১ দলের পক্ষে বিজয়ী হয়েছে। অনেকে অনেক কারচুপি করেছেন, বিজয় আটকানো যায়নি। গণভোট সম্পর্কে নাহিদ ইসলাম বলেন, ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। এ নির্বাচনে কিন্তু সুস্পষ্ট দুইটা পক্ষ ছিল। একটা সংস্কারের পক্ষ। পরিবর্তনের পক্ষ। যারা সংস্কার চায়, গণতন্ত্র চায়, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চায়। লুটপাট বন্ধ করতে চায় বিচার এবং সংস্কার চায় আধিপত্য বিরোধীতা চায়। আরেকটি পক্ষ যারা পুরনো বন্দোবস্ত, পুরনো রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছে, যারা ৭২-এর সংবিধানকে চেয়েছে, যারা পুরনো যত ধরনের রাজনীতি আছে, যারা ঋণখেলাপীদেরকে প্রশ্রয় দিয়েছে, যারা লুটপাট দুর্নীতি সে একই রাজনীতি করতে চায়। ফলে জনগণ ব্যাপকভাবে যে ৬০ শতাংশের বেশি সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সে একই জনগণ কিন্তু ১১ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এ ১০ শতাংশের মতো ভোট কারচুপি করা হয়েছে। ফলাফলে কারচুপি করা হয়েছে। না হলে এ পুরা ভোটটা ১১ দলের পক্ষে আসতো। শেষ মুহূর্তে ১১ দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষমতা নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

            বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছে, যে সব আসনে কারসাজি, অন্যায় আচরণ করা হয়েছে। যাদের অধিকার জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সিদ্ধান্ত তারা প্রতিকার চাইবেন। সুনির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে যদি প্রতিকার না পাই তাহলে আমরা বাধ্য হবো, আমাদের পথ ধরতে। আমরা আশা করবো নির্বাচন কমিশনের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা ন্যায় ইনসাফ করবে। না করলে দায় তাদেরকে নিতে হবে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

            ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন ও ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল জনগণ। স্বাচ্ছন্দে স্বস্তির সঙ্গে তারা ভোট দিতে চেয়েছিল। আমরা গতকাল রাতে বলেছিলাম, বাংলাদেশে আমরা সুস্থ ধারার রাজনীতির পক্ষে। আমরা চাচ্ছি, ইতিবাচক দ্বারা রাজনীতি করবো। আর আমরা এ বলেছিলাম, আমাদের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ আছে, আপত্তির জায়গা আছে। নির্বাচন মানে হার জিতের ব্যাপার থাকবে স্বাভাবিক। সে হার জিতটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয় তাহলে কারো সেখানে বড় কোনো আপত্তি থাকে না। সবাই সাধারণত মেনে নেয়। কিন্তু যদি সেখানে বড় ধরনের কোনো বৈষম্য অথবা অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবে এটা প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে গতকাল এ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরে আজকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের কর্মী সমর্থক, এজেন্ট, ভোটার বিভিন্ন জায়গায় অনেক বাড়িতে হামলা হচ্ছে। ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়িতে। এটা তো ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। যে ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর জাতির জন্য খুব দুর্ভাগ্যজনক এবং এর সম্পূর্ণ দায় তাদেরকে নিতে হবে যারা এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হবে। আমরা চাইলে যদি তারা ইতিবাচক ধারার রাজনীতি না চান তাহলে আমরা জোর করে ইতিবাচক রাজনীতি করতে পারবো না।

            জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে যেভাবে পেয়ে থাকুন। এ ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট অবজারভেশন, আপত্তি আছে। দায় মূলত তাদেরকে নিতে হবে। দেশের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে। যদি তারা সরকার গঠন করে এটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু এখন এগুলা কিসের আলামত। এখন এ গুলা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, এখনো যদি এ গুলো বন্ধ করা না হয় আমরা বাধ্য হবো, যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে। আমাদের তরুণ সমাজ যারা বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে আমাদের উপর এ আমানত রেখেছে, আমরা কথা দিচ্ছি, নির্বাচনের আগে যা বলেছি, তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।

            ১২ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭ টা থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একটানা ভোট চলে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এদিন ২৯৯ আসনে ভোট হয়েছে। জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নেওয়ার জন্য এ গণভোটের আয়োজন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *