পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কে নতুন মোড় বাংলাদেশ: অমীমাংসিত বিষয় ভোলেনি বাংলাদেশ

ফিচার ডেস্ক: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়। প্রায় দেড় যুগ পর স্থবির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নিতে বেশ আগ্রহী ইসলামাবাদ। ঢাকা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি। এর উদ্যোগ হিসেবে ১৫ বছর পর চলতি সপ্তাহে ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আলোচনায় মোটা দাগে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কানেক্টিভিটি; বিশেষ করে আকাশপথে যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলাসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এছাড়া সার্ক, ওআইসি, ডি-৮ এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে। ২০১০ সালে সর্বশেষ ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেছিল দুই দেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিবেরা। এছাড়া অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের অর্থনৈতিক কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক হয় ২০০৫ সালে। দীর্ঘদিনের জট খোলার পর আশা করা হচ্ছে এবারের আলোচনায় পরবর্তী অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠক নিয়ে কথা হবে। সর্বশেষ ২০১২ সালে সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার ঢাকা সফর করেন।

            দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে আন্তরিক বাংলাদেশ। আগে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো ভুলে যায়নি ঢাকা। বাংলাদেশ মনে করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন, সম্পদের হিস্যা, ১৯৭০ সালে অবিভক্ত পাকিস্তানের ঘূর্ণিঝড়ের সময় দেওয়া বৈদেশিক সহায়তার পাওনা পরিশোধের মতো বিষয়গুলোর সুরাহা জরুরি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুই দেশের সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রস্তাব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি যৌথ কমিশন পুনর্বহালের বিষয়টি তুলতে পারে পাকিস্তান। এছাড়া বাংলাদেশের দিক থেকে সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত কর্মসূচির প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে পাকিস্তানকে। অমীমাংসিত বিষয়গুলো সুরাহা না করে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ আগ্রহী নয়। ঢাকার চাওয়া, পাকিস্তান এগিয়ে আসুক। কারণ, অমীমাংসিত বিষয়গুলো সুরাহা যতদিন না হবে ততদিন সামনে আসবে। আলোচনার টেবিলে থাকবে।

            ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের অতি আগ্রহের কারণে মনে হয়েছে দুই দেশ বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদের সম্পর্কে যে নতুন মাত্রা পেয়েছে সেটি দৃশ্যমান। ইতোমধ্যে বিদেশের মাটিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ হয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। প্রথমে নিউইয়র্ক এবং পরে মিসরে। প্রথম সাক্ষাতে ড. ইউনূস একাত্তরের প্রসঙ্গ না তোলায় দেশের অনেকে নেতিবাচক সমালোচনা করেছেন। মিসরে একাত্তরের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি প্রধান উপদেষ্টা। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বেশকিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা গেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের করাচি থেকে কন্টেইনারবাহী একটি জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে যে সুযোগ আগে ছিল না। গত ডিসেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশের ভিসা প্রাপ্তি সহজ করার নির্দেশ দেয়। আগে পাকিস্তানি নাগরিক ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত উন্নত দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র লাগত। এছাড়া সেপ্টেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, বাংলাদেশিদের জন্য পাকিস্তানের ভিসার চার্জ লাগবে না। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের এক সামরিক কর্মকর্তা ইসলামাবাদ সফর করেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফপিসিসিআই) একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

            শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের অতি আগ্রহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে। ২০১২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খারের ঢাকা সফরের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এ সময় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ডি-৮ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২২ সালের জুলাইয়ে সে হিনা রাব্বানির ডি-৮ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে ঢাকায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনি তখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু হিনা রাব্বানি ঢাকায় আসেননি। তার ঢাকা সফর বাতিল হওয়ার কারণ হিসেবে তৎকালীন ঢাকার দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য ছিল, ডি-৮ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগমুহূর্তে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সঙ্গে পাকিস্তানের পতাকা জুড়ে দিয়ে ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশন ফেসবুকে একটি ছবি প্রকাশ করে। এ নিয়ে এ সময় ঢাকার প্রতিক্রিয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় পাকিস্তান হাইকমিশনকে। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি পাকিস্তান। এছাড়া ২০২১ সালে পাকিস্তানে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) মন্ত্রী পর্যায়ের জরুরি বৈঠকে অংশ নিতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের। কিন্তু শেষ সময়ে তিনি সফরটি বাতিল করেন। তার বদলে বৈঠকে পাঠানো হয় তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনকে। এর বাইরে ২০২২ সালের মার্চে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনকে ইসলামাবাদে দুই দিনব্যাপী ওআইসির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের ৪৮ তম অধিবেশনে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনিও সফরে না গিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠান।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *