
স্টাফ রিপোর্টার, বান্দরবান: বান্দরবানে সামাজিক উৎসব বিজু উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহন করে চাকমা জনগোষ্ঠী। শনিবার (১২ এপ্রিল) বাঘমারা এলাকায় নোয়াপতং নদীতে ফুল ভাসিয়ে ফুল বিজু উদযাপন করে চাকমা জনগোষ্ঠী। এর আগে বিজু উদযাপন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য বিজু র্যালী আয়োজন করা হয়। বাংলা নববর্ষ বিজু গয্যাপয্যা দিনে সন্ধায় আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে এ বিজু উদযাপনে সহযোগিতা করে চাকমা কালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফোরাম।
চাকমা কালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফোরাম সভাপতি বিনয় জ্যোতি চাকমা বলেন, বান্দরবান জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে এ বার প্রথম সামাজিক উৎসব বিজু উদযাপন করা হচ্ছে। অনেক বছর ধরে প্রত্যাশা ছিল চাকমা জনগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে বিজু উৎসব উদযাপন করা। প্রতি বছর ধারাবাহিক বজায় রেখে সমন্বয়ে বিজু উৎসব আয়োজন করা। এভাবে বান্দরবান জেরায় সুবিধা বঞ্চিত চাকমা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বয়ে কাজ করতে সামাজিক সংগঠন চাকমা কালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফোরাম সমাজিক দায়বদ্ধতার সাথে কাজ করছে। চাকমা জনগোষ্ঠীর ৩ দিন ব্যাপী এ সামাজিক উৎসব বিজু উদযাপনে রয়েছে ফুল বিজু দিনে বিজু র্যালী, গঙ্গা মা পুজার আয়োজনে ফুল দিয়ে বরণ ও ফুল ভাসানো। মূল বিজু দিনে রয়েছে পাজন পরিবেশন, আপ্যায়ন ও সামাজিকতা। বাংলা নববর্ষ বিজু গয্যাপয্যা দিনে সন্ধায় রয়েছে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

চাকমা জনগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব বিজু: চাকমা জনগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব বিজু হল একটি ৩ দিন ব্যাপী সামাজিক উৎসব। যা চাকমা জনগোষ্ঠীর বাংলা বর্ষ সনের নতুন বছরের সূচনাকে স্মরণ করে এবং পুরাতন বছরকে বিদায় জানাতে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উৎসব। ধারণা করা হয় চৈত্র সংক্রান্তিকে চিহ্নিত করে যেটি বাংলা ক্যালেন্ডারের শেষ দিন এবং বৈশাখ শুরুতে নববর্ষ উদযাপন এ উৎসব পরবর্তীতে বিজু উৎসব ধারন করেছে। এর পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে এ বিজু উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব হিসাবে পালন করে আসছে। এ বিজু উৎসব চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে ৩ দিন ধরে পালন করা হয়। আগের যুগে এ উৎসবটি পুরো এক পাক্ষিক ধরে চলত।
ফুল বিজু: চাকমা জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব প্রথম পর্ব ফুল বিজু। বিজু পালনের প্রথম দিন আর নববর্ষ বরনের প্রস্তুতি দিন ফুল বিজু। এ দিনে ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয় আর ঘরবাড়ির জিনিসপত্র ধুয়ে মুছে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। ফুল বিজু দিনে ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজিয়ে ঘরকে পবিত্র ও নিজের মনকে পবিত্র করে পরিশুদ্ধ করা আর নববর্ষ আগমনকে স্বাগত জানানো। এ ফুল বিজু দিনে ঘরবাড়ি সাজাতে নাগশা ফুল ব্যবহার গুরুত্ব বেড়ে যায় অপরিসীম। নাগশা ফুল বা নাগেশ্বর ফুল অতি সুন্দর, সুগন্ধ ও মনে করা হয় পবিত্রার প্রতীক। ফুল বিজু দিনে এ নাগেশ্বর ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হলে অধিক আনন্দ ও মুগ্ধতায় আসে মনের পবিত্রতা। নাগেশ্বর ফুল পাওয়া না গেলে ফুল বিজু দিনে বিভিন্ন ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়।
নববর্ষের আগমন উপলক্ষে সামাজিক ঐতিহ্য ও প্রচলিত রীতি নীতি নিয়মে ফুল বিজু দিনে নদীতে ফুল দিয়ে গঙ্গা পূজা করছে বহু দিন ধরে চাকমা জাতিগোষ্ঠী। ফুল বিজু দিনে ভোর সকালে নতুন বছরে অনাবিল সুখ শান্তি কামনায় নারী পুরুষ সকলে গঙী মা বা গঙ্গা মা উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল দিয়ে বরণ করে গঙ্গা পূজা করে।এখন অনেকে ধর্মীয় আচার রীতি নীতি নিয়মে জল বুদ্ধ বা উপগুপ্ত বুদ্ধ উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল দিয়ে করে থাকে গঙ্গা পূজা। প্রচলিত নিয়মে কলা পাতার উপর ফুল সাজিয়ে নদীর কিনারে রেখে প্রদীপ জ্বালিয়ে নববর্ষের মঙ্গল কামনা উদ্দেশ্যে গঙ্গা পূজা করা হয়। আর নববর্ষের মঙ্গল কামনায় কলা পাতার উপর ফুল সাজিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। ফুল বিজু দিনে প্রচলিত এ দুই নিয়মে ফুল দিয়ে করা হয় গঙ্গা পূজা। এখন বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আনুষ্ঠানিক ও সমন্বয়ে নারী পুরুষ সকলে মিলে নদীতে ফুল ভাসিয়ে ফুল বিজু আনন্দ উপভোগ করে। ফুল বিজু দিনে সকলে ফুল ভাসানো মাধ্যেমে জাতির শান্তি ও মঙ্গল কামনা করা হয়।
মুল বিজু: চাকমা জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব দ্বিতীয় পর্ব মূল বিজু। বিজু পালনের দ্বিতীয় দিন আর বিজু উৎসবে আনন্দ উপভোগের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন মূল বিজু। মূল বিজুর দিন গৃহিনীরা খুব ভোরে উঠে বিজু উৎসবে পরিবেশনের জন্য পাজন, নানা ধরনের স্বাদের পিঠা ও পানীয় তৈরী করে। বেলা বাড়ার সাথে দল বেঁধে ছোট ছেলে মেয়ে, যুবক যুবতি, বৃদ্ধ বৃদ্ধা এ বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি গিয়ে কোন ভেদাভেদ না রেখে ধনী গরিব, উচু নিচু, ধর্ম বর্ণ সব সম্প্রদায় সম্প্রীতির বন্ধনে আপ্যায়ন গ্রহন ও আনন্দ ভাগাভাগি করে। পার্বত্য অঞ্চলে বিজু উৎসব এক অনন্য সাম্য, মৌত্রী ও সম্প্রীতি অটুট বন্ধন। সারাদিন রাত ব্যাপী চলতে থাকে পাজন ও বিভিন্ন খাদ্য দিয়ে পরিবেশন ও আপ্যায়ন। গৃহিনী ও গৃহকর্তার মধ্যে গভীর রাতে পাজন ও অন্যান্য খাদ্র দ্রব্য পরিবেশনে অলসতা ও কার্পণ্যতা পরিলক্ষিত হয় না। এ মূল বিজু পর্বের আপ্যায়ন গ্রহন ও আনন্দ ভাগাভাগি মুল আকর্ষণ হচ্ছে পাজন। এটা হলো অনেক রকমের সবজি একসঙ্গে মিশিয়ে রান্নার পদ, যা কমপক্ষে ৫ টি এবং বেশি হলে ৩২ রকমের অধিক সবজি মিশিয়ে রান্না করা হয়। পাজনের রান্না, খাওয়া ও প্রশংসা সাথে গৃহিনী গৃহকর্তার জন্য শুভ কামনা করা হয়। পাজনে বহু প্রকার সবজি থাকায় ঔষধি গুণ পাওয়া যায়। মূল বিজু দিনে আপ্যায়নে উপকরণ পাজন নিয়ে জনশ্রুতি ও লোক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। এ দিনে কমপক্ষে ৭ গৃহের পাজন খেলে পরবর্তী বছর জীবনের সমস্ত দু:খ বেদনা ও যে কোন রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকা যায়।
চাকমা জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব মূল বিজু দিনে পরিবেশন ও আপ্যায়নে আনন্দ উপভোগের সীমা শেষ নেই। এ দিনে মূলত অতিথি পরায়ণ ও অতিথি সেবা করার সামাজিক রীতি ও কৃষ্টির বহি:প্রকাশ ঘটে। এক সময় সমাজ ব্যবস্থায় ছিল সরলতা, আত্নবিশ্বাস, সহানুভূতি, মানবতাবোধ ও রীতি নীতির সমন্বয়। আর এ সমাজ ছিল ধর্মীয় প্রভাব মুক্ত ও প্রকৃতি পূজারী। সমাজে ছিলনা অন্যান্য প্রভাব ও প্রতিপত্তি নিয়ন্ত্রণ। সমাজ পরিচালিত হত সামাজিক রীতি নীতির উপর ভিত্তি করে। ধারণা করা হয় সমাজিকতা অভ্যাস নিমন্ত্রণ, পরিবেশন ও আপ্যায়ন এ রীতি নীতি ধারাবাহিক বজায় রাখতে সামাজিক উৎসব মূল বিজু পালন করা হয়। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মূল বিজু দিনের পরিবেশন ও আপ্যায়ন সমাজিকতার ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে ও সমাজের সম্প্রীতি বন্ধন করেছে চির অম্লান।
গয্যাপয্যা দিন বাংলা নববর্ষ: চাকমা জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব তৃতীয় পর্ব গয্যাপয্যা দিন বিজু। বিজু পালনের তৃতীয় দিন আর বিজু উৎসবের শেষ দিনে পবিত্র ও মঙ্গল কামনা করে নববর্ষ বরণের গয্যাপয্যা দিন। এ গয্যাপয্যা দিন এর অর্থ আনন্দে ও আরাম আয়েসে গড়াগড়ি ও লুটোপুটি খেয়ে বিশ্রাম করা। বিজু উৎসব নিয়ে এত দিনের প্রস্তুতি ও ব্যস্ততার যে ক্লান্তি দেখা দেয় এ ক্লান্তি দুর করার জন্য বিশ্রাম প্রয়োজন। বিজু উৎসবের শেষ দিন মুলত ক্লান্তি দুর করতে রাখা হয়েছে গয্যাপয্যা দিন। বিজু উৎসবের গয্যাপয্যা দিন নিয়ে চাকমা সমাজে লোক বিশ্বাস রয়েছে। বিজু উৎসবের গয্যাপয্যা এ দিনটি শুভ নববর্ষের প্রথম দিন। মুলত এ কারনে গয্যাপয্যা দিন আনন্দ, আরাম আয়েস, ভাল খাবারের আয়োজন ও সুন্দর করে নববর্ষের প্রথম দিন শুরু করলে সারা বছর থাকবে সুখ শান্তি, মঙ্গল ও পবিত্রতা।
বিজু গয্যাপয্যা এ দিনে আনন্দ ও পবিত্র মনে প্রত্যেক গৃহে সামর্থ্য অনুযায়ী মুখরোচক ভোজনের ব্যবস্থা করা হয়। বিজু উৎসবের অনুষ্ঠানের বা মুল বিঝজু দিন আত্নীয় স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্খি যারা ব্যস্ততার কারনে অংশগ্রহন করতে পারেনি তাদেরকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। বিজু গয্যাপয্যা দিন ছোট ছেলে মেয়েরা বয়স্কদের স্নান করিয়ে আশীর্বাদ প্রর্থনা করে। এখন চাকমা সমাজে বিজু উৎসব গয্যাপয্যা দিন বা নববর্ষের প্রথম দিন ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতি নীতিঅনুযায়ী আচার অনুষ্ঠান পালন করে। বিজু গয্যাপয্যা এ দিনে বৌদ্ধ বিহার, কিয়াং ও জাদিতে গিয়ে ধর্মীয় রীতিতে পিন্ড দান, বিভিন্ন দানীয় বস্তুদানের কাজ সম্পাদন করা হয়। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিবারের মঙ্গল ও বিশ্বশান্তির জন্য গৃহে বৌদ্ধ ভিক্ষু বা ভান্তে ফাং করে মঙ্গল সুত্র শোনার আয়োজন করে পালিত হয় বিজু উৎসব গয্যাপয্যা দিন।

