পযর্টন ডেস্ক: প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড শিলং। সবুজে ঘেরা পাহাড়, আকা-বাঁকা উঁচু-নিচু পথ, সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে যেতে পারেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে। ঢাকা থেকে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে খুব সহজে যেতে পারেন সেখানে। বাংলাদেশে যেমন ঝর্ণা খুঁজে বের করে দেখতে যেতে হয় মেঘালয়ে এর পুরোটা বিপরীত। চলার পথে আপনার মনে হতে পারে ঝর্ণা আপনাকে দেখতে এসেছে। ছোট বড় মিলিয়ে এখানে যে কত ঝর্ণা রয়েছে তার হিসাব হয়তো কারো কাছেই নেই। ঝকঝকে রোদ, হঠাৎ অন্ধকার, ঝুম বৃষ্টি। এরপর এক পশলা মেঘ এসে আপনাকে ভিজিয়ে যেতে পারে। মেঘালয়ের প্রকৃতিটা যেন এমন। জুন থেকে আগস্ট অর্থাৎ বর্ষায় শিলং ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।

            দর্শনীয় স্থান এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলাইনং। এক পাশে বাংলাদেশের সিলেটের তামাবিল সীমান্ত এবং অন্য পাশে ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি সীমান্ত। তামাবিল ডাউকি দিয়ে সহজে এবং কম সময়ে যাওয়া যায় শিলং। তামাবিল সীমান্ত পার হলে ডাউকি বাজার। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি চলে যাওয়া যায় চেরাপুঞ্জি। এখানে রয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলাইনং। এটি মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসিয়া পাহাড় জেলায় অবস্থিত একটি গ্রাম। এখানে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে অনেকগুলো ঝর্ণা। বৃষ্টি না হলে ঝর্ণায় পানির পরিমাণ খুবই কম থাকে। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলাইনং। ঝর্ণা আর মাওলাইনং দেখা সঙ্গে চেরাপুঞ্জি যেতে পথের দু’পাশে দেখা মিলবে উঁচু নিচু সব পাহাড়। মনে হবে সব পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সবচেয়ে উঁচু পাহাড় দিয়ে যাচ্ছেন। চেরাপুঞ্জিতে থাকার জন্য অনেক হোটেল ও হোম স্টে সার্ভিস রয়েছে। যাওয়ার আগে এগোডা, মেক মাই ট্রিপ বা বুকিং ডট কম থেকে বুকিং দিয়ে যাওয়া ভালো। কারণ সেখানে হোটেল ও হোম স্টে সার্ভিসগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও একসঙ্গে এসব পাওয়া যায় না। তাই গিয়ে খুঁজতে চাইলে ভ্রমণের আনন্দ অনেকটা নষ্ট হতে পারে। কারণ ডাউকি থেকে সব দর্শনীয় স্থান থেকে চেরাপুঞ্জি যেতে যেতে দুপুর ৩-৪টা বেজে যায়। হোটেল বা হোম স্টে সার্ভিস নিতে দুই জনের জন্য প্রতি রাত খরচ হতে পারে ২০০০ – ২৫০০ রুপি। ডাউকি বাজার থেকে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে চেরাপুঞ্জি যেতে ট্যাক্সি ভাড়া নেবে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ রুপি।

            দর্শনীয় স্থান সেভেন সিস্টার ফলস। সকালবেলা উঠে হোটেল চেক আউট করে সরাসরি চলে যাবেন সেভেন সিস্টার ফলস। এটি চেরাপুঞ্জির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। বৃষ্টি হলে এর সৌন্দর্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই জলপ্রপাত এর উচ্চতা ১,৪৮৪ মিটার। চেরাপুঞ্জির স্থানীয় নাম সোহরা বা সোরা। সেভেন সিস্টার ফলস দেখে যাওয়া যায় মোসামাই গুহা। যার ভেতরের চারপাশে শুধু পাথর। এই প্রাকৃতিক গুহায় প্রবেশের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে আপনাকে রোমাঞ্চিত করবে। চেরাপুঞ্জিতে সেভেন সিস্টার ফলস ও মোসামাই গুহা দেখার পর কয়েকটি ঝর্ণা দেখা যায়। এখানেও অনেকগুলো বড় ঝর্ণা রয়েছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন তা ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। কারণ এসব জায়গা দেখা শেষ করে যাওয়া যায় শিলং। চেরাপুঞ্জি থেকে সব দর্শনীয় স্থান দেখে শিলং যেতে যেতে দুপুর ২-৩টা বেজে যাবে। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শিলং যেতে ট্যাক্সি ভাড়া নেবে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ রুপি। শিলং গিয়ে পছন্দ করে হোটেল ঠিক করে নেওয়া যায়। শিলং এর পুলিশ বাজারের পাশের হোটেল গুলোতে পর্যটকরা বেশি থাকেন। এখানকার সেন্টার পয়েন্টের পাশে অনেক হোটেল রয়েছে।

            দর্শনীয় স্থান সকালবেলা উঠে লাইট লুম দেখা যাবে। শিলং পুলিশ বাজার থেকে এখানে যেতে সময় লাগবে ৪০-৪৫ মিনিট। এখানকার সৌন্দর্য লিখে শেষ করা যাবে না। পাহাড়ের উপর সবুজ উঁচু নিচু মাঠ। মাঠের তিন পাশে মেঘের ভেলা। সবুজ মাঠে বসে চায়ে চুমুক দিতে এক পশলা মেঘ এসে আপনাকে ভিজিয়ে দিতে পারে। লাইট লুম থেকে ফিরে এদিন শিলং শহরের পাশে উমিয়াম লেক, এলিফ্যান্ট জলপ্রপাত, শিলং ভিউপয়েন্ট, গলফ লিংক, ওয়ার্ডস লেক ঘুরে আসা যায়। এছাড়াও গাড়ির ড্রাইভার এর সঙ্গে চুক্তি করে স্পটগুলো নির্ধারণ করা যাবে। শুধু লাইট লুম দেখতে চাইলে ট্যাক্সি খরচ পড়বে ১৫০০ রুপি। সঙ্গে অন্যান্য জায়গা দেখতে চাইলে ২৫০০ থেকে ৩০০০ রুপি খরচ হবে। সব জায়গা দেখা শেষ করে শপিং করা যাবে। শিলংয়ে পুলিশ বাজারে বিশাল নামের একটা সুপার শপ আছে সেখান থেকে শপিং করা যাবে। এছাড়াও আশে পাশে অনেক হকার্স মার্কেট রয়েছে। কেনাকাটা শেষে একটু সিনেমা দেখে সময় পার করা যায়। শিলংয়ে একটি ভালো সিনেপ্লেক্স রয়েছে। অঞ্জলি নামের এই সিনেপ্লেক্সটি পুলিশ বাজার থেকে হেটে যেতে ১৫ মিনিট সময় লাগবে। আর ট্যাক্সিতে যেতে ১০০ থেকে ১৫০ রুপি ভাড়া নেবে।

            দর্শনীয় স্থান ডাউকি ও স্নোনেংপেডেং। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ৭টার মধ্যে ডাউকির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেন। ডাউকি সীমান্ত আসার আগে স্নোনেংপেডেং যেতে পারেন। স্নোনেংপেডেং এর স্বচ্ছ পানির নদী আপনাকে মুগ্ধ করবে। চাইলে নৌকা নিয়ে ঘুরতে পারেন। শিলং থেকে স্নোনেংপেডেং হয়ে ডাউকি সীমান্তে আসতে ট্যাক্সিতে খরচ হবে ২৫০০-৩০০০ রুপি। সবশেষে বিকেল ৫টার মধ্যে ভ্রমণ সমাপ্ত ও ইমিগ্রেশন শেষ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা যাবে।

            ভ্রমণে দরকারি তথ্য প্রয়োজনে কাজে লাগবে। ১. ভারতের মেঘালয়ের শিলং ভ্রমণের জন্য পাসপোর্টে ৬ মাসের মেয়াদসহ বাই রোড ডাউকি পোর্ট দিয়ে ভিসা থাকতে হবে। ২. ভ্রমণ কর ৫০০ টাকা ঢাকা, সিলেট বা তামাবিল সীমান্তের সোনালী ব্যাংকে দিতে হবে। তবে ঢাকা থেকে যারা যাবেন তারা ঢাকায় দিয়ে গেলে কম সময়ে ইমিগ্রেশন শেষ করা যায়। ৩. ভারত ভ্রমণের জন্য ডলার বা টাকা নিয়ে যাওয়া যায়। ইমিগ্রেশন শেষ করে ডাউকি বাজার থেকে রুপি করা যয়। শিলং এর চেয়ে ডাউকি বাজারে ভালো রেট পাওয়া যায়। ৪. সব জায়গায় ট্যাক্সি নেওয়ার আগে দামাদামি করা ভাল। কমপক্ষে ৩ জনের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সব জায়গার মানুষজন বাংলা মোটামুটি বুঝে। ৫. মেঘালয়ে যাওয়ার আগে অবশ্য হোটেল বুকিং দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ৬. মেঘালয় ভ্রমণের জন্য ৪ জনের দল হলে সবচেয়ে ভালো। কারণ এক ট্যাক্সিতে ৪ জনের জায়গা হওয়াতে যাতায়াত খরচ কমবে।

            ভারতের শিলং কিভাবে যাবেন। ঢাকা থেকে সিলেটে বাস, ট্রেন বা আকাশ পথে যেতে পারেন। সিলেট থেকে বাস, সিএনজি বা গাড়িতে যেতে হবে তামাবিল সীমান্তে।

            খাবার সুব্যবস্থা রয়েছে। মেঘালয়ের সব জায়গায় ভেজ ও নন-ভেজ থালি পাওয়া যায়। এছাড়া মেনু থেকে পছন্দ অনুযায়ী খাবার নেয়া যায়। তবে খাবারের স্বাদ বাংলাদেশের খাবারের চেয়ে অনেকটা ভিন্ন। এজন্য জায়গা ভেদে ভিন্ন রেস্টুরেন্টের খাবার টেস্ট করা যায়।

            খরচাপাতি হিসাব সুবিধা করে খরচ করা যায়। ঢাকা থেকে ট্রেনে সিলেট। এরপর সিলেট থেকে সিএনজিতে তামাবিল। ডাউকি থেকে ট্যাক্সিতে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে চেরাপুঞ্জি। চেরাপুঞ্জিতে হোটেলে থাকা। আবারো অনেক জায়গা ঘুরে শিলং। হোটেলে থেকে লাইট লুম হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ট্যাক্সিতে। সিনেমা দেখে সকালে স্নোনেংপেডেং ঘুরে আবারো তামাবিল থেকে সিএনজি, সিলেট থেকে ট্রেনে ঢাকা। তিন রাত হোটেলে থাকা, খাবার, ট্যাক্সি ভাড়া, ভ্রমণ কর, সিএনজি ভাড়া, ট্রেন ভাড়াসহ সব মিলে ৩ রাত ৪ দিনে আপনার খরচ হবে বাংলাদেশি টাকা ১৫ হাজার টাকা। তবে ভ্রমণ দলের সদস্য হতে হবে কমপক্ষে ৩ জন এবং সর্বোচ্চ ৪ জন।

খবরটি 274 বার পঠিত হয়েছে


আপনার মন্তব্য প্রদান করুন

Follow us on Facebookschliessen
oeffnen