আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের আফগানিস্তান ত্যাগ এবং সরকারি বাহিনীর পতনের মুহূর্তে তালেবানের দ্রুত উত্থানের মধ্যে প্রতিরোধের জমিন হয়ে উঠছে পাঞ্জশির। ছোট এক উপত্যকায় গত দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো আবারও উড়ছে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের পতাকা। আফগান নতুন শাসকদের জন্য তারা কতোটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারবে তা এখনও অপষ্ট। তবে ইউনাইটেড ইসলামিক ফ্রন্ট ফর দ্য স্যালভেশন অব আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিক নামধারী গোষ্ঠীটির পুনর্জন্ম এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কাবুল থেকে পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হিন্দু কুশ এলাকায় অবস্থিত পাঞ্জশির। ১৯৮০’র দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনও প্রতিরোধ করেছে উপত্যকাটি। আবার ১৯৯০’র দশকে তালেবানের পাঁচ বছরের শাসনের সময়ও সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি তালেবান। এই মুহূর্তে সেখানে নতুন করে জড়ো হয়েছে সদ্য উৎখাত হওয়া সরকারের বহু সামরিক, রাজনৈতিক নেতা। পুরনো প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছেন তারা। এদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ। তিনি নিজেকে দেশটির সাংবিধানিকভাবে বৈধ সরকার প্রধান ঘোষণা করেছেন।

            পাঞ্জশির এলাকায় জন্ম ও প্রশিক্ষিত আমরুল্লাহ সালেহ যোগ দিয়েছেন ৩২ বছর বয়সী আহমেদ মাসুদের সঙ্গে। তিনি পাঞ্জশিরের কিংবদন্তি নেতা আহমেদ শাহ মাসুদের ছেলে। ৯/১১ হামলার দুই দিন আগে তাজিক জনগোষ্ঠীর এই কিংবদন্তিকে হত্যা করে আল কায়েদা। ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা এক নিবন্ধে আহমেদ মাসুদ তালেবানবিরোধী লড়াইয়ে পশ্চিমাদের সমর্থন এবং অস্ত্র সহায়তা চেয়েছেন। ‘আমি আজ পাঞ্জশির উপত্যকা থেকে লিখছি, পিতার পদাঙ্ক অনুসরণে প্রস্তুত, সঙ্গে রয়েছেন মুজাহিদিন যোদ্ধা, তারা আরও একবার তালেবানবিরোধী লড়াইয়ে প্রস্তুত। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে তখন তালেবানকে হারাতে মার্কিন বাহিনীকে গোয়েন্দা, বিশেষ বাহিনী আর ঘাঁটি দেয় নর্দার্ন অ্যালায়েন্স। তবে এবার তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। গত ১৫ আগস্ট তালেবান রক্তপাত ছাড়াই কাবুলের দখল নেওয়ার পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াই চায় না তারা। কূটনৈতিক তৎপরতা আর কৌশলগত চাপের উপরই ভরসা করতে চাইছে তারা। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তো বলেই দিয়েছেন, আফগানদের নিজেদের লড়াই নিজেদেরই করতে হবে। এছাড়া নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের প্রতিরোধ কতোটা জোরালো হবে কিংবা এটা কেবলই তালেবানের সঙ্গে আপোষের কৌশল কিনা তাও এখনও অস্পষ্ট।

            কতটা শক্তিশালী নর্দার্ন অ্যালায়েন্স: পাঞ্জশিরে যে পথে সামরিক উপকরণ আর সরবরাহ পেয়ে থাকে সেই তাজিকিস্তান সীমান্ত এখন তালেবান নিয়ন্ত্রণে। আর পাঞ্জশিরে কী পরিমাণ যোদ্ধা জড়ো হয়েছে তাও এখনও অষ্পষ্ট। সাবেক আফগান কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন সাবেক সেনা সদস্য আর মার্কিন প্রশিক্ষিত যোদ্ধার সংখ্যা সেখানে আড়াই হাজার ছাড়াবে না। তাদের অস্ত্র-শস্ত্রও দুর্বল। বিপরীতে তালেবান দখলে নিয়েছে আফগান বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে ব্লাক হক হেলিকপ্টার, ড্রোন, হাম্বি আর মাইন প্রতিরোধী গাড়ি।

            আসলেই কি আপোষের কৌশল: নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমরুল্লাহ সালেহ বলেছেন তারা তালেবানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের প্রতিশোধের বদলে প্রকৃত শান্তি চান। তালেবান যদি অর্থপূর্ণ আলোচনায় তৈরি থাকে, আমরা স্বাগত জানাবো। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রকৃত শান্তির পরিবেশ নেই বলেও বিশ্বাসের কথাও জানান তিনি। আন্তর্জাতিক সমালোচনা সীমিত রাখতে তালেবানের কণ্ঠেও শোনা গেছে আপোষের সুর। কাবুল দখলের পর তালেবানের ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ শত্রুদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। বলেছেন তারা অন্তর্ভূক্তিমূলক ইসলামিক সরকার চান।

            চ্যালেঞ্জ কতটা: আফগানিস্তানে ঐক্যমতের সরকার গড়তে হলে তালেবানকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। নানান ভূপ্রকৃতি আর জাতিগোষ্ঠীর কারণে আফগানিস্তান এমনিতেই এক জটিল সমীকরণের দেশ। আর তার উপরে প্রকাশ্য প্রতিরোধের মুখোমুখি হলে স্থিতিশীল সরকার গঠনই তাদের জন্য কঠিন।তালেবানের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ দেখা গেছে জালালাবাদে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সেখানে গুলি চালিয়ে অন্তত তিন জনকে হত্যা করেছে তালেবান। তালেবান পতাকা নামিয়ে সরকারি পতাকা ওড়ানো এই বিক্ষোভ ছড়িয়েছে আরও কয়েকটি শহরে।

তাজিকিস্তানের আফগান দূতাবাসের দূত জহির আকবর জানিয়েছেন তিনি আমরুল্লাহ সালেহর সরকারকেই স্বীকার করছেন। আফগান পুলিশ বাহিনীর সাবেক এই প্রধান বলেন, আমি বলতে পারি না তালেবান যুদ্ধে জিতেছে। না। কেবল তালেবানের সঙ্গে গোপন আলোচনার মাধ্যমে পালিয়ে গেছেন আশরাফ গণি। আর কেবল পাঞ্জশির প্রতিরোধ করছে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালে। মানুষকে যারা দাসে পরিণত করতে চাইবে তাদের বিরুদ্ধেই শক্তভাবে দাঁড়াবে পাঞ্জশির। সূত্র: ব্রিটিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট

খবরটি 79 বার পঠিত হয়েছে


আপনার মন্তব্য প্রদান করুন

Follow us on Facebookschliessen
oeffnen