বিশেষ খবর ডেস্ক: বিশ্বের জনসংখ্যা এ শতাব্দীর শেষ হওয়ার আগে অর্ধেকে কমে আসবে। ২১০০ সালে এ শতাব্দীর শেষ সময় হবে আনুমানিক বিশ্বের জনসংখ্যা ৮৮০ কোটি। বিশ্বের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ থাকবে ২০৬৪ সালে প্রায় ৯৭০ কোটি। জাতিসংঘের বর্তমান অনুমানের চেয়ে বিশ্বের জনসংখ্যা ২০০ কোটি কম। এই চিত্র অনেকটা পাল্টে যাবে চলতি শতাব্দীর শেষভাগে। ২১০০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা নেমে আসতে পারে ৮ কোটি ১০ লাখ। জাপান ও স্পেনসহ ২৩টি দেশের জনসংখ্যা ২১০০ সাল নাগাদ একেবারে অর্ধেক হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি সব দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেকগুন বেড়ে যাবে। যত নতুন শিশু জন্ম নেবে ৮০ বছর বা তদুর্ধ মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় তার সমান। জাতিসংঘের বিশ্বের জনসংখ্যা গবেষণা প্রতিবেদন তথ্য অনুযায়ী আনুমানিক বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৮০ কোটি। বিশ্বের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ থাকবে ২০৫০ সালে প্রায় ৯৭০ কোটি এবং ২১০০ সালে শতাব্দীর শেষ সময় আনুমানিক বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ১ হাজার ৯০ কোটি হবে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুসারে যেটা চলতি বছরের মধ্যভাগে প্রকাশিত বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৮৩ জন। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ১১ শতাংশ। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের ৮ম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল বিশ্বের জনসংখ্যা বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। সাপ্ম্প্রতিক বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি এক গবেষণা সমীক্ষার প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যায় যে বিরাট ধস নামবে সমাজের ওপর তার প্রভাব হবে বিরাট। যেভাবে জন্ম হার কমছে, তার ফলে এই শতাব্দীর শেষে বিশ্বের প্রায় সব দেশের জনসংখ্যা কমে যাবে। বিশ্ব জুড়ে জন্মহার কমতে শুরু করেছে। বিশ্বের বেশিরভাগ অংশের দেশে মধ্যে এখন উত্তরণ ঘটছে কম জনসংখ্যার দিকে।

            যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বিশ্ব জনসংখ্যা পরিসংখ্যান গবেষণা প্রতিবেদন: যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি বিশ্ব জনসংখ্যা গবেষণা প্রতিবেদন ২০২১ সালের ১৪ জুলাই যুক্তরাজ্যের শীর্ষ চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাময়িকী ল্যানসেটে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। বিশ্ব জনসংখ্যা নিয়ে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রতিক গবেষণা মডেল অনুসারে এসব তথ্য জানা গেছে। ২০৬৪ সালের পর গর্ভধারণ এবং শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে মূলত বিশ্ব জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি ৯০ লাখ। এরপর অবস্থান ১৩৬ কোটি ৭৩ লাখ জনসংখ্যা দেশ ভারত। ২১০০ সাল নাগাদ কমতে কমতে চীনের জনসংখ্যা নেমে আসবে ৭৩ কোটি ২০ লাখ। চীনের জায়গায় বিশ্বের জনবহুল দেশের স্থান করে নেবে ভারত। ২১০০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম জনবহুল দেশ হবে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত। এ সময় ভারতের জনসংখ্যা হবে ১০০ কোটি ৯০ লাখ। পাকিস্তানের বর্তমান জনসংখ্যা ২৪ কোটি ৮০ লাখ। ২১ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার জনসংখ্যা নিয়ে পাকিস্তান অবশ্য বর্তমানের পঞ্চম অবস্থানে থাকবে। শুধুমাত্র পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সকল দেশ ২১০০ সালে তাদের জনসংখ্যার বিপুল পতন লক্ষ্য করবে। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ ভুটানে সবচেয়ে কম জনসংখ্যা পতন ঘটবে। ভুটানের ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যা বর্তমানের জনসংখ্যা ৯ লাখ ৬৬ হাজার থেকে ৭ লাখ ৭০ হাজারে নামবে। বাংলাদেশের পর দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যা কমার দিক থেকে দ্বিতীয় প্রভাবিত দেশ হবে হিমালয় কন্যা নেপাল। দেশটির ২ কোটি ৯৮ লাখ ৯০ হাজারের জনসংখ্যা নামবে ১ কোটি ৮০ লাখ ৯ হাজারে। জাপানের জনসংখ্যা ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সেবছর দেশটির জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৮০ লাখ। এরপর থেকে কমতে শুরু করে জাপানের জনসংখ্যা। এই শতাব্দীর শেষে এসে জাপানের জনসংখ্যা কমে দাঁড়াবে ৫ কোটি ৩০ লাখের নীচে। এরকম ইতালির জনসংখ্যায় নাটকীয় ধস নামবে। ইতালির জনসংখ্যা ৬ কোটি ১০ লাখ হতে এই শতাব্দীর শেষে কমে দাঁড়াবে ২ কোটি ৮০ লাখ।  বিশ্বে জাপান ও স্পেনসহ এরকম ২৩টি দেশ আছে এই শতাব্দীর শেষে জনসংখ্যা অর্ধেকের নীচে নেমে যাবে। এই তালিকায় আরও আছে পর্তুগাল, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ। বিশ্বজুড়ে জন্মহার যে কমছে তাকে জনসংখ্যা হ্রাসের অনেকদিক থেকে একটি সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্ব জনসংখ্যা পরিসংখ্যান এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ সমীক্ষার তথ্য।

            একই গবেষণার আওতায় ২০৬৪ সালে আগামী ৪৪ বছর পর বৈশ্বিক জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৭০ কোটিতে উন্নীত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ২১০০ সাল শেষ নাগাদ জনসংখ্যা সংকুচিত হয়ে নেমে আসবে ৮৮০ কোটি। বিশ্বে এখন সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন। এ সময় চীনের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। এরপর চীনের জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে। চীন, ভারত, নাইরেজরিয়াসহ বহু দেশে জনসংখ্যা কমে আসবে। ব্রিটেনের জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০৬৪ সাল নাগাদ সর্বোচ্চ ৭ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাবে। ২১০০ সাল শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়াবে ৭ কোটি ১০ লাখ। একটি মহাদেশ এর ব্যতিক্রম। আফ্রিকার সাবসাহারা অঞ্চলে দেশগুলোর জনসংখ্যা ২১০০ সাল নাগাদ তিনগুণ বেড়ে ৩০০ কোটিতে পৌঁছাবে। জনসংখ্যার দিক থেকে তখন নাইজেরিয়া হবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। নাইজেরিয়ার জনসংখ্যা বেড়ে হবে ৭৯ কোটি ১০ লাখ। ততদিনে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার এই বিষয়টি সারাবিশ্বের জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তখন অনেক দেশে আফ্রিকান বংশোদ্ভুত বিরাট জনগোষ্ঠী থাকে তখন বর্ণবাদ নিয়ে বিশ্বকে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তখন বর্ণবাদ নিয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

            জন্মহার কমে যাওয়ার কথা শুনলে প্রথমে যেসব কথা মনে আসে। পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া বা এরকম অন্যান্য বিষয় যা জনসংখ্যা হ্রাস বিষয়ে সেসবের কোন সম্পর্ক আসলে নেই। জনসংখ্যা হ্রাসে মূল কারণ আসলে শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। এর পাশাপাশি জন্মনিরোধকের সহজলভ্যতা। এসব কারণে মেয়েরা এখন কম সন্তান নিতে আগ্রহী। ভবিষ্যতে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার, ঘরের বাইরে কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং গর্ভনিরোধ পদ্ধতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গর্ভধারণের সংখ্যা কমে যাবে। একজন নারী গড়ে যত শিশু জন্ম দেয় তাকে ফার্টিলিটি রেট বা সন্তান জন্ম দানের হার। এই ফার্টিলিটি রেট অনেকদিন ধরে কমছে। যখন কোন দেশে ফার্টিলিটি রেট ২.১ এর নীচে নেমে যায় তখন সেই দেশের জনসংখ্যা কমতে থাকে। ১৯৫০ সালে বিশ্বে ফার্টিলিটি রেট ছিল ৪ দশমিক ৭ ছিল। অর্থাৎ একজন মা গড়ে ৪ দশমিক ৭টি শিশু জন্ম দিত। ২০১৭ সাল নাগাদ বিশ্বে এই ফার্টিলিটি রেট প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। তখন ফার্টিলিটি রেট ছিল ২ দশমিক ৪। এই শতকের শেষে ২১০০ সালে ফার্টিলিটি রেট আরও কমে ১ দশমিক ৭ এ নেমে আসবে।

            সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে ২০২১ সালের বৈশ্বিক শিশু জন্মহার বর্তমানের ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে ২১০০ সালে নেমে আসবে ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অভিবাসনের হিসাব বাদ দিলে নারীরা মাথাপিছু ২ দশমিক ১টি সন্তানের জন্ম দিলে কেবল একটি দেশের জনসংখ্যা বাড়ে বা স্থির থাকে। ২০৬৪ সাল নাগাদ ১৫১টি দেশের মোট মাতৃত্বহার আলোচিত ২ দশমিক ১ শতাংশের নিচে থাকবে। আর ২১০০ সাল নাগাদ ১৮৩টি দেশের ক্ষেত্রে এই হার হবে আরও কম। তখন মাতৃত্বহার হবে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। এরফলে স্পেন, জাপান ও থাইল্যান্ড মতো কিছু দেশের জনসংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কমে যেতে পারে ২০১৭ সালের জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের তুলনায়। বাংলাদেশে শিশু জন্মহার ২০১৭ সালের জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের ২ শতাংশ থেকে নেমে আসবে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তা শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ বেশি হবে। ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১৮৩টি দেশের জন্ম হার এত নীচে নেমে যাবে জনসংখ্যা আগের অবস্থায় ধরে রাখা যাবে না। ২০১৭ সালে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা যেখানে ৬৮কোটি ১০ লাখ, ২১০০ সালে তা কমে দাঁড়াবে ৪০ কোটি ১০ লাখ। ২০১৭ সালে যেখানে ৮০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ১০ লাখ, ২১০০ সালে তা দাঁড়াবে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ। বিশ্বের একমাত্র দেশ সুইডেন নানা চেষ্টা করে দেশের জন্মহার ১ দশমিক ৭ হতে ১ দশমিক ৯ পর্যন্ত বাড়াতে পেরেছে। অন্য অনেক দেশ বহু চেষ্টা করে জন্মহার বাড়াতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের জন্মহার এখনো ১ দশমিক ৩ এ আটকে আছে। বিশ্বের কিছু দেশ জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য নানা রকম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর মধ্যে আছে মাতৃত্ব এবং পিতৃত্ব ছুটি বাড়ানো, বিনামূল্যে শিশুদের যত্ন ও দেখাশোনার ব্যবস্থা, আর্থিক প্রণোদনা এবং কর্মক্ষেত্রে বাড়তি অগ্রাধিকারের ব্যবস্থা করা। এই সমস্যার কোন সুস্পষ্ট সমাধান আসলে এখনো নেই। বিশ্বের জনসংখ্যা হ্রাস এটি এক বিশাল সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বৈশ্বিক এই জনসংখ্যা হ্রাস সংকট এড়াতে হলে একটা ধারাবাহিক উত্তরণের লক্ষ্যে সুষম পরিকণ্পনা প্রয়োজন হবে।

            ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রফেসর ইব্রাহীম আবুবকর বলছেন, এসব ভবিষ্যদ্বাণীর অর্ধেক যদি সঠিক হয় তাহলে অভিবাসন সব দেশের জন্য অত্যাবশকীয় হয়ে উঠবে। এটিকে তখন আর একটি বিকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। আমাদেরকে সফল হতে হলে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে নতুন করে মৌলিক ভাবনা চিন্তা করতে হবে। মানব সভ্যতার সমৃদ্ধি বা পতনের ক্ষেত্রে কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কিভাবে বন্টন করা যায়, সেই প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

            ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইন্সটিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস এন্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই) কর্মকর্তা এবং রিপোর্টের প্রধান লেখক ক্রিস্টোফার মারে সংবাদসংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, বিশ্বের জনসংখ্যা বর্তমানে যেভাবে বাড়ছে. আগামী দিনে সে প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা খুব কম। তিনি আরও জানান, তাদের গবেষণা জাতিসংঘের পূর্বের একটি গবেষণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জাতিসংঘ এ গবেষণার আওতায় চলতি শতাব্দী জুড়ে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকার অনুমান করেছিল। তবে আগামী ৪০ বছরে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের বিষয়টি তারা মেনে নিয়েছেন। এই শতাব্দী শেষে তরুণদের তুলনায় বৃদ্ধের সংখ্যা অনেকটা বেড়ে যাবে। নারী শিক্ষার বিস্তার, সহজলভ্য গর্ভনিরোধ সুবিধা এবং জন্মহার হ্রাসের ধারা কোনভাবে বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

            জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা পরিসংখ্যান গবেষণা প্রতিবেদন: জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক দফতরের জনসংখ্যা বিভাগ থেকে ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্ট ২০১৯ হাইলাইটস’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ১৯৫০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পরিচালিত ১ হাজার ৬৯০টি জাতীয় আদমশুমারির ফল ব্যবহার করে এ নতুন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এতে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন ব্যবস্থা ও ২ হাজার ৭০০ নমুনা জরিপের তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্বের জনসংখ্যা প্রতিবেদনে ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৯৭০ কোটি বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৭০ কোটি। আগামী ৩০ বছরের মধ্যে তা আরও ২০০ কোটি বেড়ে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি ৯৩ লাখ। জনসংখ্যার বিশ্বের ৮ম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। সর্বাধিক জন্মহারের দেশ বাহরাইন। সর্বনিম্ন জন্মহারের দেশ লিথুনিয়া। শূন্য জনসংখ্যার দেশ ৫টি বেলারুশ, ইতালি, মন্টিনিগ্রো, উত্তর মেসোডোনিয়া ও স্পেন। আর সাব সাহারান আফ্রিকার জনসংখ্যা বাড়বে দ্বিগুণ। প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২১০০ সলের চলতি শতকের শেষ দিকে বিশ্বের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে প্রায় ১ হাজার ৯০ কোটি। বৈশ্বিক জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি হবে তার অর্ধেকের বেশি হবে নয় দেশ ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইথিওপিয়া, তাঞ্জানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র। আর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনের জনসংখ্য বৃদ্ধির হার কমে যাবে ২.২ শতাংশ। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ চীনকে ২০২৭ সালে হিসেবে ভারত ছাড়িয়ে যাবে অনুমান করা হচ্ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ ১৫১টি দেশের মোট মাতৃত্বহার আলোচিত ২ দশমিক ১ শতাংশের নিচে থাকবে। আর ২১০০ সাল নাগাদ ১৮৩টি দেশের ক্ষেত্রে এই হার হবে আরও কম। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, প্রজননের হার হ্রাস ও জনসংখ্যা কমতে থাকা দেশের সংখ্যা বাড়তে থাকার কারণে বিশ্ব জনসংখ্যার গড় বয়স বৃদ্ধি পাবে। গরিব দেশগুলোর মানুষ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ৭ বছর কম হবে। বৈশ্বিক প্রজনন হার ১৯৯০ সালে ছিল প্রতি নারীতে ৩.২, তা ২০১৯ সালে কমে ২.৫ এ দাঁড়িয়েছে। সেটি ২০৫০ সালে কমে ২.২ হবে। ২০১১ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৭০০ কোটিতে পৌঁছায় আর এখন বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৭০ কোটি। ‍বৈশ্বিক শিশু জন্মহার বর্তমানের ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে ২১০০ সালে এ শতাব্দীর শেষে নেমে আসবে ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিশ্বের জনসংখ্যা পরিসংখ্যানে ২১ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার জনসংখ্যা নিয়ে পাকিস্তান অবশ্য বর্তমানের পঞ্চম অবস্থানে থাকবে।

            জাতিসংঘ প্রকাশিত ২০২১ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সারাবিশ্বে প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ছে ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। বর্তমান ৭৮০ কোটি জনসংখ্যার সাথে ২০৫০ সালে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে আরও ২০০ কোটি যোগ হবে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট জনসংখ্যা ৯৭০ কোটিতে উন্নীত হবে। ২১০০ সালে চলতি শতকের শেষ দিকে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১১০০ কোটি। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, প্রজননের হার হ্রাস ও জনসংখ্যা হ্রাসমান দেশের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিশ্ব জনসংখ্যার গড় বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ৭০ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। ১৯৭৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বে জনসংখ্যা সম্মিলিতভাবে ৫০০ কোটি অতিক্রম করলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা চিহ্নিত হয়। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই ৯০টির বেশি দেশে এটি প্রথমবারের মতো জনসংখ্যা দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়েছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি হবে তার অর্ধেকের বেশি হবে ৯টি দেশে। সেগুলো হল ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইথিওপিয়া, তাঞ্জানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ (৪৭০ কোটি) রয়েছে এশিয়া অঞ্চলে। আফ্রিকায় ১৭ শতাংশ (১৩০ কোটি), ইউরোপে রয়েছে ১০ শতাংশ (৭৫ কোটি) ও আমেরিকায় ১২ শতাংশ (১০৫ কোটি)। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ এশিয়ার দেশ চীনে এবং ১৮ শতাংশ ভারতে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ২০২৭ সালে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে যাবে এ অনুমান করা হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে ২৭ দেশ বা অঞ্চলে ১ শতাংশ বা তার বেশি জনসংখ্যা হ্রাস পেতে দেখা গেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের জনসংখ্যা দুই দশমিক দুই শতাংশ কমে যাবে। ইউরোপের কিছু দেশে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় এ অঞ্চলে বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমে যাবে। আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের জনসংখ্যা ২০৫০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হবে। এ সময়ের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির অর্ধেক হবে আফ্রিকায়। বৈশ্বিক প্রজনন হার ১৯৯০ সালে ছিল প্রতি নারীতে ৩.২, তা ২০১৯ সালে কমে ২.৫ এ দাঁড়িয়েছে। সেটি ২০৫০ সালে কমে ২.২ হবে। জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া রোধ এবং এক প্রজন্মকে আরেক প্রজন্ম দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে প্রতি নারীতে প্রজনন হার থাকতে হয় ২.১। গরিব দেশগুলোর মানুষ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ৭ বছর কম বাঁচেন। ১৯৯০ সালের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৪.২ বছর থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৭২.৬ বছর হয়েছে। তা ২০৫০ সালে আরও বেড়ে ৭৭.১ বছর হবে এ আশা করা হচ্ছে। ১৯৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ২৫০ কোটি। গত ৭০ বছরে তা তিনগুণ বেড়ে ৭৮০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ১৯৫৫ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ২৮০ কোটি, যা এখন দুই দেশ ভারত ও চীনে রয়েছে। ১০০ কোটি জনসংখ্যা ছিল ১৮০৪ সালে। পরবর্তী ১২৩ বছরে ১৯২৭ সালে হয় ২০০ কোটি। ৩৩ বছরে ১৯৬০ সালে ৩০০ কোটি ছাড়ায়। এর পরের মাত্র ১৪ বছরে ১৯৭৪ সালে ৪০০ কোটি, ১৯৮৭ সালে ১৩ বছরে ৫০০ কোটি, ১৯৯৯ সালে ১২ বছরে ৬০০ কোটি ও ২০১১ সালে ১২ বছরে ৭০০ কোটি হয়।

            জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এ বৃদ্ধি অসম। বিশ্বের সবচেয়ে স্বল্পোন্নত দেশের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো আরও জোরদার হয়েছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সামনে হাজির হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের অগ্রগতি অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে আমরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবাসহ নারীর অধিকারের প্রতি ধাক্কা দেখছি। এখনও ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ গর্ভাবস্থায় জড়িত ইস্যু।

            বাংলাদেশের বিশ্ব জনসংখ্যা পরিসংখ্যান গবেষণা প্রতিবেদন: জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা পরিসংখ্যান চলতি বছরের মধ্যভাগে প্রকাশিত অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৮৩ জন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ১১ শতাংশ। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের ৮ম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকবে ২০৩৯ সালে। এ সময় দেশের মোট জনসংখ্যা হতে পারে প্রায় ১৭ কোটি ৩৪ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি বিশ্ব জনসংখ্যা গবেষণা প্রতিবেদন সাউথ এশিয়ান মনিটর, টিবিএস ২০২১ সালে (১৪ জুলাই) যুক্তরাজ্যের শীর্ষ চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাময়িকী ল্যানসেটে এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এ বিশ্ব জনসংখ্যা গবেষণা প্রতিবেদন তথ্যানুসারে এই চিত্র অনেকটা পাল্টে যাবে চলতি শতাব্দীর শেষভাগে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৭০ লাখ। এ শতাব্দীর শেষে ২১০০ সালে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ কমবে। ৮০ বছর পর ২১০০ সালে এ শতাব্দীর শেষে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নেমে আসতে পারে ৮ কোটি ১০ লাখ। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এটা হবে জনসংখ্যার সর্বোচ্চ পতন। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জিত হলে এই সংখ্যা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় এসডিজি অর্জিত হলে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আরও কমে হবে ৭ কোটি ৪১ লাখ। এই সময়ে বাংলাদেশে জন্মহার কমে আসবে অনেকটা। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে জন্মহার ছিল প্রায় ২ শতাংশ। ২১০০ সালে এটি কমে আসতে পারে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর এসডিজি অর্জন করলে এটি দাঁড়াবে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশের মতো স্পেন, জাপান, ইতালির জনসংখ্যা অর্ধেক কমার সম্ভবনা রয়েছে।

খবরটি 153 বার পঠিত হয়েছে


আপনার মন্তব্য প্রদান করুন

Follow us on Facebookschliessen
oeffnen